বজরা শাহী মসজিদ মোঘল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য স্মারক
মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
১৮শ শতাব্দীতে নির্মিত বৃহত্তর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বজরা শাহী মসজিদ। নোয়াখালী জেলাধীন সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নে আনিন্দ্য সুন্দর মসজিদটি অবস্থিত। এটি মাইজদীর চারপাশে অবস্থিত উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা গুলির একটি। মোঘল সম্রাট ভারত উপমহাদেশে ৩০০ বছরেরও বেশি সময় রাজত্ব করেন। এ দীর্ঘ সময়ে মোঘল সম্রাট এবং তাদের উচ্চপদের আমলারা বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ইমারত ও মসজিদ নির্মাণ করেন যা আজও স্থাপত্যশিল্পের বিরল ও উজ্জ্বল নির্দশন। বজরা শাহী মসজিদ এগুলোর মধ্যে অনন্য। দিল্লির শাহী মসজিদের আদলে নির্মিত মসজিদটি ১৭৪১-৪২ সালে মোঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের আমলে জমিদার আমান উল্লাহর তদারকিতে নির্মাণ করা হয়। যা আজও মোঘল স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। মসজিদটির চারপাশ প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত। প্রবেশপথ পূর্ব দিকে। মসজিদের কাছেই দীঘি। সেটার পশ্চিম পারে উঁচু ভিতের ওপর বানানো হয়েছে এটি। আকর্ষণীয় তোরণ বিশিষ্ট মনোমুদ্ধকর সুনিপুণ নকশায় ভরপুর মসজিদটি আয়তাকার (১৬ মিটার বাই ৭.৩২ মি.)। উত্তর দক্ষিণে লম্বা। বাইরের চার কোনায় অষ্টভূজাকৃতির বুরুজ রয়েছে। পূর্বে তিনটি, উত্তরে ও দক্ষিণে একটি করে মোট পাঁচটি দরজা। দরজার বাইরের দিকে ও দুই পাশে সরু মিনার। পূর্বদিকের তিনটি দরজা বরাবর কিবলা দেয়াল। যার ভেতর তিনটি মেহরাব আছে। মাঝের মেহরাবটি অন্য দু’টির চেয়ে বড়। মসজিদের ভেতর দুটি কক্ষ। যা বহুখাঁজবিশিষ্ট আড়াআড়ি খিলান দিয়ে তিনভাগে বিভক্ত। ছাদের ওপর তিনটি কন্দাকৃতির গম্বুজ আছে। এগুলোর শীর্ষভাগ পদ্ম ও কলস চূড়ার নকশা দ্বারা সজ্জিত। জমিদার আমান উল্যাহ তার বাড়ির সম্মুখে ৩০ একর জমির ওপর উঁচু পাড় যুক্ত দীঘিটি খনন করেন। এ মসজিদটিকে মজবুত করতে মাটির প্রায় ২০ ফুট নিচ থেকে ভিত্তি তৈরি করা হয়। গম্বুজগুলোর সৌন্দর্য বাড়ানো হয়েছে মার্বেল পাথর দিয়ে। প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি ধনুকাকৃতি দরজা। প্রবেশ পথের ওপর রয়েছে কয়েকটি গম্বুজ। ১৯১১ থেকে ১৯২৮ সালের মাঝামাঝিতে বজরার জমিদার খান বাহাদুর আলী আহমদ ও খান বাহাদুর মুজির উদ্দিন আহমদ মসজিদটি ব্যাপকভাবে মেরামত করেন। নানান রঙের সিরামিকের মোজাইক দিয়ে সজ্জিত করেন তারা। মোঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের বিশেষ অনুরোধে পবিত্র মক্কা শরিফের অধিবাসী (কারো মতে, দিল্লির বাসিন্দা) বুযর্গ হযরত মাওলানা শাহ আবু সিদ্দিকী এ মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর বংশধররা যোগ্যতা অনুসারে আজও এ মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমান ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ হাসান সিদ্দিকী তাঁরই সপ্তম পুরুষ। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বজরা শাহী মসজিদে মানুষ এসে নামাজ আদায় করেন। গত এক যুগ ধরে নারীরাও নামাজ পড়ার পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে এ মসজিদে। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯৮ সালে ২৯ নভেম্বর সরকারি গেজেটে মসজিদটিকে প্রত্ন সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে করে মোঘল আমলের স্থাপনাটি দিন দিন জলুস হারাচ্ছে।
এলাকাবাসী জানায়- মসজিদের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নতুন করে সিরামিক স্থাপন করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো মসজিদকে আনা হয়েছে সিসি ক্যামেরার আওতায়। অনন্য স্থাপত্য শৈলীর কারণে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এখানে নামাজ পড়তে আসেন। ঘুরতেও আসেন দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকগণ। জনশ্রুতি রয়েছে যে, এ মসজিদে কিছু মানত করলে তাতে শুভ ফল পাওয়া যায়। তাই দেখা যায় যে, দুরারোগ্য ব্যাধি হতে মুক্তি পাওয়ার আশায় অগণিত নারী-পুরুষ প্রতিদিন এ মসজিদে টাকা-পয়সা সিন্নি দান করেন।
কোন মন্তব্য নেই