ভুজপুর ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি
মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুর থানাধীন কাজিরহাট বাজারের দক্ষিণ পশ্চিম পাশে একটি টিলার উপর রয়েছে এক ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। যা স্থানীয়দের কাছে কাজী বাড়ি ও মিঞা বাড়ি নামে পরিচিত। এছাড়াও ফাঁসির ঘর হিসেবেও অনেকের কাছে পরিচিত। প্রায় তিনশ’ বছর আগে কাজী সিহাব উদ্দিন নামক এক জমিদার শাসন করতো বর্তমান সময়ের ফটিকছড়ি উপজেলা এলাকাটি। এরই ধারাবাহিকতায় ভূজপুরে কাজী বাড়িতে গড়ে উঠেছিল প্রাসাদ, বিচার কাজের জন্য আদালত, ফাঁসির মঞ্চসহ সবকিছু। অষ্টাদশ শতাব্দীর চট্টগ্রমের বিখ্যাত জমিদার কাজী শাহাব উদ্দিন চৌধুরীর দাদা মহব্বত সাধু ছিলেন গৌড় নগরের বাসিন্দা। সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম এসে তিনি সস্ত্রীক বসতি স্থাপন করেন ফেনীর দাঁদরায়। তার একমাত্র ছেলের নাম সাদুল্লাহ। সাদুল্লাহ’র তিন ছেলের একজন কাজী শাহাব উদ্দিন চৌধুরী। অন্য দু’জন হলেন আনিস মুহাম্মদ ও মুহাম্মদ হোসেন। কাজী শাহাব উদ্দিন তৎকালীন ১৮০০ শতক এলাকাজুড়ে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন। আর একের পর এক তাঁর উত্তরসূরীরা উক্ত জমিদারী পরিচালনা করেন। জমিদার কাজী শাহাব উদ্দিনের পর জমিদার হন তার পুত্র কাজী হায়দার আলী চৌধুরী। কাজী হায়দার আলীর পর জমিদার হন কাজী হাসমত আলী চৌধুরী। তিনি খুবই সু-পরিচিত একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ছিল আলিফ লায়লা ও চিনফগপুর শাহ নামের দুটি পুঁথি। এই জমিদার বংশের অনেক সুনাম ছিল। কারণ তারা তাদের জমিদারী এলাকায় অনেক সমাজসেবামূলক কাজ করেছেন। প্রজাদের কল্যাণে মোগল স্থাপত্যের আদলে ২৪টি মহাল, ১২টি তরফ, ২২টি দীঘি, ২২টি মসজিদসহ বহু সামাজিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এছাড়াও অনেক রাস্তাঘাটসহ ২২টি কালভার্টও নির্মাণ করেছিলেন। সুনামের পাশাপাশি এই জমিদার বংশের একটি দুর্নামও ছিল ফাঁসির মঞ্চের কারণে। যা মূলত ব্রিটিশদের সন্তুষ্টি করার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। জমিদারের প্রতি সম্মান স্বরূপ ব্রিটিশরা এ স্থানে বছরে ৭ জন আসামিকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার রেওয়াজ প্রচলন করেছিল। ফটিকছড়ির বর্তমান আদালতের কার্যক্রম আগে এখানেই চলতো। বংশ পরম্পরায় কাজী শাহাব উদ্দিন চৌধুরী ও তার বংশধরেরা প্রায় দু’শ বছর জমিদারি করেছেন ভূজপুরে। ফটিকছড়ির প্রায় অর্ধশত বর্গকিলোমিটার এলাকা জমিদারির আওতায় ছিল। ভূজুপর বাজারটি সেই থেকে কাজিরহাট নামে পরিচিত। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ছিল তাদের জমিদারি। জমিদার বংশের সর্বশেষ জমিদার ছিলেন কাজী দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির মাধ্যমে তার জমিদারীর পরিসমাপ্তি ঘটে। এখনো এই জমিদার বংশধররা এখানে বসবাস করছেন। বাংলাদেশের সাবেক অষ্টম প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ এই জমিদার বংশেরই ছিলেন।
জমিদার বাড়িতে প্রায় ৬০ কক্ষ বিশিষ্ট একটি প্রাসাদ তৈরি করা হয়। প্রাসাদের ভিতরে একটি ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করা হয়। বাড়ির চারপাশে পরিখাঁ খনন করা হয়। বাড়ির উত্তর পাশে মোঘল স্থাপত্যে তৈরি করা হয় একটি মসজিদ। তিনশ’ বছর আগের প্রাচীন নিদর্শন জমিদার বাড়ি ও ফাঁসির ঘরটি বর্তমানে অরক্ষিত থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন বিলুপ্তির পথে ভূজপুরের। ফাঁসির মঞ্চটি এখন আর নেই। প্রাসাদটির দেয়ালগুলোতে ছোট ছোট বটবৃক্ষের চারা। নানা ধরনের লতাপাতায় ছেয়ে গেছে দেয়ালগুলো। ধসে পড়েছে উপরের ছাদ। ষাট কক্ষের বিশাল প্রাসাদ এখন অনেকটা বিলীন হয়ে গেছে। একসময় এখানে ছিল জমিদারের সোনা-রুপা খচিত বিশাল চেয়ার। প্রতিরাতে বসতো নাচ-গানের আসর। বছর বছর হতো রাজপুন্যাহ উৎসব। হাজার হাজার লোক খাজনা দিতে আসতেন কাজী বাড়িতে। কিন্তু কালের গর্ভে এসব হারিয়ে গেছে। চারপাশের দেয়ালগুলোই শুধু ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে প্রবেশ করতে এখন ভয় লাগে। তবে এ ভয় মিঞা সাহেবের নয়, এ ভয় সাপ বিচ্ছুর। আর জমিদার বাড়ির চারপাশের সেই পরিখাঁটিও এখন আর নেই। তবে রাজসাক্ষি হিসেবে জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে নয়নাভিরাম মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। ৩টি গম্বুজ আর ১২টি ছোট মিনারযুক্ত মসজিদটি তিনশত বছর আগে তুর্কী কৌশলীরা চুন সুরকির মিশ্রণ দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন। কালের আবর্তে মুসল্লি বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৯৭-৯৮ সালে পরবর্তী প্রজন্ম মসজিদের বারান্দা নির্মাণ করে কিছুটা সংস্করে করেন। যা এখন কাজী বাড়ি মসজিদ নামে পরিচিত।
ভূজপুরের বাসিন্দা প্রদীপ চৌধুরী বলেন, ‘তিনশ বছর আগের এই জমিদার বাড়ি ও ফাঁসির ঘরটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এখানে খনন করলে অনেক মূল্যবান পুরাকীর্তি পাওয়া যেতে পারে’। এলাকায় ঘুরতে আসা পর্যটক মুহাম্মদ নিজাম বলেন, ‘এখানে এত সুন্দর একটা প্রাচীন একটা স্থাপনা আছে, সেটা আমরা জানতাম না।’ কাজী বাড়ির বংশধর কাজী হামিদ বলেন, ‘আমাদের বাপ-দাদারা এখানে বসে জমিদারি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে সংস্কার করলে এখানে পর্যটন স্থাপনা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।’ বর্তমানে বেঁচে থাকা জমিদার পরিবারের বংশধর স্কুল শিক্ষক কাজী ইকবাল হোসেন জানান, ‘তৎকালীন জমিদার হায়দার আলীর আমলে (১৭৬৫ - ১৮৪৫খ্রি.) জমিদারির আওতায় মোঘল স্থাপত্যের আদলে ২৪টি মহাল ১২টি তরফ ছিল। এ ছাড়াও ছিল ২২টি দীঘি, মসজিদসহ বহু সামাজিক প্রতিষ্ঠান। জমিদার বংশের অপর সন্তান ব্যবসায়ী কাজী তৌহিদুল আলম বলেন, ঐতিহ্যবাহী বহু স্মৃতি বিজড়িত কাজি বাড়ি সংরক্ষণের জন্য সরকারের বিভিন্ন দফতরে আমরা লিখিত অনেক আবেদন নিবেদন করেছি। কিন্তু এটির সংস্কার বা সংরক্ষণে সরকারি কোনো প্রকার সহায়তা পাওয়া যায়নি।
ফাঁসির মঞ্চ নিয়ে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে নানান ধারণা থাকলেও এটি নিয়ে জমিদার বাড়ির লোকজনের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন কথা। শিক্ষক ইকবাল হোসেন জানান, এটি ছিল একটি প্রতীকী মঞ্চ। এখানে কোনো লোককে ফাঁসি দেওয়া হতো না। বৃটিশ লর্ড সকল প্রশাসনিক কাজ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে কাজি শাহাব উদ্দিনকে জমিদারী চালাতে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন। এতে বিচারিক কর্মকান্ড চালানো এবং বছরে অন্তত সাতজনকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। যা পরবর্তীতে ফাঁসির মঞ্চ হিসেবে প্রকাশ পায়।
লিখক: আরবি প্রভাষক, রাণীরহাট আল-আমিন হামেদিয়া ফাযিল মাদরাসা; খতিব, রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ জামে মসজিদ, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম।
কোন মন্তব্য নেই