Header Ads

Header ADS

আল্লামা হাশেমী (রহ.) : জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ব্যক্তিগত কৃতিত্বের গণ্ডি অতিক্রম করে একটি আদর্শ, একটি আন্দোলন এবং একটি সভ্যতার ধারক হয়ে উঠেছে। তাঁরা কেবল একটি প্রজন্মকে নয়, বরং যুগের পর যুগ মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও নৈতিকতাকে আলোকিত করেছেন। উপমহাদেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, ইমামে আহলে সুন্নাত, শায়খুল আরব ওয়াল আজম আল্লামা কাযী মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম হাশেমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন তেমনি এক বিরলপ্রজ ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ছিল ইলম, আমল, তাকওয়া, নবীপ্রেম, দেশপ্রেম এবং মানবকল্যাণের এক অনন্য সমন্বয়। তিনি ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা, যার আলো আজও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অগণিত অনুসারীর হৃদয়ে প্রজ্বলিত। জন্ম ও বংশ পরিচয়: ১৯২৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর (১৫ রজব ১৩৪৯ হিজরি) চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জালালাবাদে এক সম্ভ্রান্ত ধর্মপরায়ণ কাযী পরিবারে তাঁর শুভ জন্ম। পিতা শাহ সুফী মাওলানা কাযী আহছানুজ্জামান হাশেমী (রহ.) এবং মাতামহ বাংলার মোহাদ্দিসে আযম, চট্টগ্রাম শাহী জামে মসজিদের সাবেক ইমাম ও খতীব আল্লামা ছফিরুর রহমান হাশেমী (রহ.)—উভয় দিক থেকেই তিনি ইলম, আধ্যাত্মিকতা ও নববী আদর্শের উত্তরাধিকার লাভ করেন। তিনি পিতৃসূত্রে হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং মাতৃসূত্রে ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বংশধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত। মদিনা শরীফ থেকে বাগদাদ, সেখান থেকে দিল্লি এবং পরবর্তীতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে তাঁদের আগমন বাংলার ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। শিক্ষাজীবন শৈশব থেকেই তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় প্রকাশ পায়। মাত্র ছয় বছর বয়সে পবিত্র কুরআন মাজীদ খতম করেন। গৃহেই পিতার নিকট আরবি, ফারসি, উর্দু ও বাংলা ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে ওয়াজেদিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৪৫ সালে জামাতে পঞ্জুম পরীক্ষায় শিক্ষা বোর্ডের কৃতিত্বসূচক সনদ ও স্বর্ণপদক অর্জন তাঁর অসামান্য মেধার স্বীকৃতি বহন করে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকার সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে তৎকালীন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম, মাজমাউল বাহরাইন আল্লামা মুফতি সৈয়দ আমীমুল এহছান মুজাদ্দেদী বরকতী (রহ.)—এর সান্নিধ্যে হাদীস, তাফসীর, ফিকহ ও ইসলামী দর্শনের গভীর গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। এ সময়েই তাঁর প্রজ্ঞা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং গবেষণামনস্কতা তাঁকে সমকালীন আলেমসমাজে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। তাঁর কাছে জ্ঞান ছিল কেবল তথ্য আহরণের বিষয় নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, মানবকল্যাণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান মাধ্যম। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত জ্ঞান মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে এবং সমাজকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা আল্লামা হাশেমী (রহ.)—এর জীবন কেবল মসজিদ—মাদ্রাসার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি ছিলেন জাতীয় চেতনারও এক সাহসী কণ্ঠস্বর। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করেন। যখন বহু ধর্মীয় নেতা পাকিস্তানি শাসকদের সমর্থন করেছিলেন, তখন তিনি নির্ভয়ে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, সহযোগিতা ও নৈতিক সাহস যুগিয়ে তিনি ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর উদ্যোগে তৎকালীন সুন্নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে রাজাকার ও আলবদর কমিটি গঠনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ধর্মীয় নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের এমন সমন্বয় বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাংগঠনিক জীবন ১৯৬৯ সালে গাজীয়ে দ্বীনে মিল্লাত ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা সৈয়দ আজিজুল হক আল—কাদেরী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের পর আল্লামা হাশেমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্যতম প্রধান অভিভাবক হিসেবে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি সারাজীবন সুন্নি আকীদা, নবীপ্রেম এবং ইসলামের মধ্যপন্থী আদর্শ প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করেন। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কেন্দ্রীয় সভাপতি, জাতীয় ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) কমিটির আহ্বায়ক, আহলে সুন্নাত সম্মেলন সংস্থা এবং আ’লা হযরত ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তিনি সুন্নি সমাজকে সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর সুসংহত করেন। ইমাম হাশেমী (রহ.) ছিলেন রাজ পথের বীর ও খানেকার কামেল পীর ও রূহানী পথপ্রদর্শক। তিনি তরিকতের কার্যক্রম বেগবান করতে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আঞ্জুমানে মুহিব্বানে রাসূল (দ.) গাউছিয়া জিলানী কমিটি’, যা আজ দেশ—বিদেশে অসংখ্য শাখার মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য, আধ্যাত্মিকতা ও নবীপ্রেমের শিক্ষা প্রচার করছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দরবারে হাশেমিয়া আলিয়া শরীফে প্রতিবছর বারো দিনব্যাপী ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে গবেষণাধর্মী সেমিনার, নিয়মিত খাজা গরীবে নেওয়াজ (রহ.), গাউছে পাক (রহ.) ও মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)—এর স্মরণে মাহফিলের মাধ্যমে ইসলামের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগ নবীন প্রজন্মকে কুসংস্কার, উগ্রবাদ ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে দূরে রেখে নবীজির আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছে। বিশ্বমঞ্চে ইসলামের বাণী তাঁর খ্যাতি শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আমন্ত্রণে তিনি ইসলামের শান্তি, ভালোবাসা ও সহনশীলতার বাণী পেঁৗছে দেন। ১৯৯৪ সালে নিউইয়র্কে প্রাপ্ত সম্মানীর অর্থ দিয়ে “মদিনা মসজিদ” প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান প্রবাসী মুসলিম সমাজে আজও স্মরণীয়। রচনাবলী আল্লামা হাশেমী রহমাতুল্লাহি আলাইহির লেখকসত্তা তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেক উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, কলমের শক্তি সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাঁর রচিত তাজকেরাতুল কেরাম,আকাঈদ—ই বাতিল, নসিহাতুত তালিবীন, যাদুল মুসলিমীন, সত্যের আহ্বান, মুসলমানদের সম্বল, পরহেজগারদের দিশারী, ঈদে মিলাদুন্নবী কেন?, নূরে মোস্তফা, মিরাজুল মুমিনীন, দোয়ার ভাণ্ডার, শাজরাতুজ জাহাব, ওয়াজিফায়ে হাশেমিয়া,আল আরবাঈন ফি মুহিম্মাতিদ দ্বীন এবং আদ্দুররুদ দালায়িল বিকরাহাতিল জামাআতি ফিন নাওয়াফিল প্রভৃতি গ্রন্থ বাংলা ইসলামী সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তাঁর রচনার বৈশিষ্ট্য ছিল—দলীল নির্ভর আলোচনা, সহজবোধ্য ভাষা, গবেষণামূলক বিশ্লেষণ এবং হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনা। তিনি ইসলামের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরেছেন এবং একই সঙ্গে বাতিল মতবাদের জবাব যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করেছেন। চারিত্রিক গুণাবলী ইমাম হাশেমী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ব্যক্তিজীবন ছিল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সত্যবাদিতা, বিনয়, সদাহাস্য, অতিথিপরায়ণতা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবপ্রেম এবং অপরের খেঁাজখবর নেওয়ার অভ্যাস তাঁকে সকল শ্রেণির মানুষের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন আলেমের প্রকৃত পরিচয় কেবল জ্ঞানে নয়; বরং চরিত্র, আচার—আচরণ ও মানবসেবায়। ইন্তেকাল ২০২০ সালের ২ জুন (৯ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরি) লাখো ভক্ত, মুরিদ ও শুভানুধ্যায়ীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে তিনি মহান রবের সান্নিধ্যে চলে যান। কিন্তু তাঁর প্রস্থান কোনো সমাপ্তি নয়; বরং একটি আলোকিত উত্তরাধিকারের সূচনা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান, রচিত গ্রন্থ, গড়ে তোলা সংগঠন এবং অসংখ্য ছাত্র ও অনুসারী আজও তাঁর আদর্শকে বহন করে চলেছে। আল্লামা হাশেমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন একাধারে আলেম, মুফাক্কির, গবেষক, লেখক, রূহানী পথপ্রদর্শক, সংগঠক এবং দেশপ্রেমিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—প্রকৃত ইসলামী নেতৃত্ব কেবল মিম্বারে সীমাবদ্ধ নয়; তা সমাজ, রাষ্ট্র, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবকল্যাণের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। জ্ঞানচর্চা, নবীপ্রেম, দেশপ্রেম, মানবসেবা এবং আধ্যাত্মিক সাধনার যে সুষম সমন্বয় তিনি রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। বাংলার জমিনে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইতিহাস রচিত হলে ইমাম হাশেমী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নাম স্বর্ণাক্ষরে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। লেখক:আরবি প্রভাষক,তাজুশ শরীয়াহ দরসে নিযামী মাদরাসা,চট্টগ্রাম। খতিব,রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ জামে মসজিদ, রাঙ্গুনিয়া,চট্টগ্রাম।

কোন মন্তব্য নেই

আল্লামা হাশেমী (রহ.) : জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ব্যক্তিগত কৃতিত্বের গণ্ডি অতিক্রম করে একটি আদর্শ, এ...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.