Header Ads

Header ADS

চেরাগী পাহাড় : চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক




মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম 

প্রাচ্যের রাণী খ্যাত চট্টগ্রামের মাঝখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও সৃজনশীল চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র চেরাগী পাহাড়। এক দিকে আন্দরকিল্লা মোড়, পেছনে ডিসির পাহাড়, বিপরীতে জামালখান সড়কে আছে  চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব। এর মাঝেই অবস্থিত চেরাগী মোড়। 

ইতিহাসবিদদের মতে, চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারক  হযরত সৈয়দ বদর আউলিয়া (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) সমুদ্রে ভাসমান এক খণ্ড পাথরের উপর আরোহন করে তৎকালীন জন-মানবহীন গভীর পাহাড় পর্বতে ঘেরা চট্টগ্রামে আসেন। তিনি একটি অলৌকিক মাটির চেরাগ হাতে নিয়ে গভীর বন-জঙ্গল দিয়ে একটি পাহাড়ের উপর উঠলে জ্বীন-পরীরা তাকে বাধা দেয় এবং বলে, তাদের আবাস স্থলে কোন মানুষের স্থান নেই। রাতের অন্ধকার নেমে আসলে  তিনি জ্বীন পরীদের নিকট শুধু চেরাগ রাখার স্থানটুকু চাইলে তারা সম্মতি জ্ঞাপন করে। তিনি অলৌকিক চেরাগ জ্বেলে দিলে তা থেকে তীব্র তেজ বিকিরণ করতে থাকলে জ্বীনপরীরা শরীরে প্রকট জ্বালা যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকে। অতঃপর এক পর্যায়ে তারা চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং আস্তে আস্তে এখানে মানুষ বসবাস করতে শুরু করে। আজ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে সেই পাহাড়। কালক্রমে চেরাগি পাহাড় চত্বরটি হয়ে উঠে চেরাগী মোড়। ইতিহাসের স্মারক হিসেবে রাস্তার মাঝখানে রয়েছে একটি চেরাগ আকৃতির মনুমেন্ট। অনেকের মতে, এখান থেকে গোড়াপত্তন চট্টগ্রাম নগরীর এবং নামের উৎপত্তিও হয়েছে এ স্থানকে ঘিরে। প্রতীকী অর্থে এখান থেকে চেরাগ জ্বালিয়ে আলোকিত করেছিল চট্টগ্রাম এবং সেই থেকে আজ অবধি চট্টগ্রাম আলোকিত হয়ে উঠছে ক্রমাগত।

আজকাল চেরাগী মোড় বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠে অসংখ্য দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা, টিভি চ্যানেলের অফিস। পাশাপাশি রয়েছে প্রচুর প্রকাশনা সংস্থা, মুদ্রণ, হকার সমিতির কার্যালয়। মূলত চেরাগী মোড়কে কেন্দ্র করেই চেরাগী মোড়, আন্দরকিল্লা মোড় থেকে কাটা পাহাড়, চন্দনপুরা পর্যন্ত গড়ে উঠেছে বিশাল ছাপা খানার বাজার। যেখানে সকাল সাতটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছাপা খানার মেশিন ঘুরতে থাকে।

বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রামের অন্যতম এ পাহাড়ে দৈনিক লেনদেন হচ্ছে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি টাকার। যা ব্যবসা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও যথেষ্ট ভূমিকা পালন করছে। 
চেরাগী মোড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান- ব্যান্ড দল, ব্যাংক-বীমা, অ্যাডফার্ম, স্টেশনারি, কম্পিউটার প্রশিক্ষণকেন্দ্র, হাসপাতাল, সেমিনার হল, উপাসনালয়  সর্বোপরি সকল প্রকার বাণিজ্যিক, সমাজকল্যাণমূলক ও শিল্প সাহিত্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠান। 

সাংবাদিকপাড়া খ্যাত চেরাগী পাহাড়ের সন্ধ্যা কালীন আড্ডায় উঠে আসে দেশ বিদেশ নিয়ে নানা আলোচনা, সমালোচনা, তর্ক। সবুজের সমারোহে মন জুড়ায় আর প্রাণ জুড়ায় আড্ডার প্রবাহে। কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যজন, শিল্পী, গায়ক, সৃজনশীল বইয়ের পাঠক- লেখক, সংগঠক, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিককর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের আড্ডার অন্যতম ঠিকানা চেরাগী। বসার জায়গা নেই বললেই চলে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চলে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা। আজাদী ভবন, বঙ্গবন্ধু ভবন, লুসাই ভবনের নিচে তিল ধারনের ঠাঁই থাকে না। হাতে চায়ের কাপ, ঠোঁটে সিগারেট এখানে কমন দৃশ্য। চটপটি, ফুচকা, নানা রকমের পিঠাও থাকে। রাত ২টা-৩টা বা মধ্য রাতের আড্ডাবাজরা হয় অনেকটা  ভিন্ন ক্যাটাগরির। চেরাগীর মোড় ও আশেপাশের টং ঘিরে যেমন থাকে রাত জাগা সাংবাদিক তেমনি থাকে কবিতার পরের লাইন মেলানোর নেশায় ছুটে চলা দিশেহারা যুবক।

সারাবছরই দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান লেখক গবেষকদের আড্ডা থাকে চেরাগীর আশেপাশে অবস্থিত প্রকাশনা ও বইয়ের দোকান ঘিরে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা সংস্থা হলো বলাকা প্রকাশন, শৈলী প্রকাশন, আবীর প্রকাশন, নন্দন, শব্দচাষ, বাতিঘর ইত্যাদি। কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে কথাকলি নামের বইয়ের দোকানটি। 
মোড়ে অবস্থিত ফুলের দোকানগুলো এলাকাকে দিয়েছে  নান্দনিক রুপ। ফুলের সুবাসে মুগ্ধ পথচারী মনে করে এটি যেন এক ফুলের রাজ্য। 
লিখক: আরবি প্রভাষ, রাণীরহাট আল-আমিন হামেদিয়া ফাযিল মাদরাসা; খতিব,রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ জামে মসজি, রাঙ্গুনিয়, চট্টগ্রাম।            

কোন মন্তব্য নেই

 

Blogger দ্বারা পরিচালিত.