Header Ads

Header ADS

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ: মোঘল ঐতিহ্যের অনন্য স্মারক




মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সদরে নির্মিত মোঘল ঐতিহ্য ও স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। যা জুমা মসজিদ হিসেবেই সবার কাছে বেশি পরিচিত। ১৬৬৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন মোগল শাসক নবাব শায়েস্তা খাঁর পুত্র চট্টগ্রাম বিজেতা সেনাপতি উমেদ খাঁ মগ ও পর্তুগিজদের একটি আস্তানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে এর নামকরণ করা হয় ‘আন্দরকিল্লা’ এবং দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেব চট্টগ্রামের নতুন নামকরণ করেন ইসলামাবাদ। তাঁরই নির্দেশে নবাব শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ সালে চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মারক হিসেবে এই মসজিদ নির্মাণ করেন, যা দিল্লির জামে মসজিদের আদলে তৈরি। আর সেই একই রীতিতে বড় বড় পাথর ব্যবহার করে এট নির্মিত হয় বলে একে ‘পাথরের মসজিদ’ও বলা হয়। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট ওপরে ছোট একটি পাহাড়ের ওপর এর অবস্থান। মূল মসজিদের নকশা অনুযায়ী এটি ১৮ গজ (১৬ মিটার) দীর্ঘ। প্রস্থ ৭ দশমিক ৫ গজ (৬.৯ মিটার)। প্রতিটি দেয়াল প্রায় ২ দশমিক ৫ গজ (২.২ মিটার) পুরু। পশ্চিমের দেয়াল পোড়া মাটির তৈরি এবং বাকি তিনটি দেয়াল পাথরের তৈরি। মধ্যস্থলে একটি বড় এবং দুটি ছোট গম্বুজ দ্বারা ছাদ আবৃত। অষ্টভুজাকৃতির চারটি গম্বুজের মধ্যে পেছন দিকের দুটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। মসজিদটির পূর্বে তিনটি ও উত্তর এবং দক্ষিণে একটি করে মোট ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। এতে তিনটি মেহরাব থাকলেও  মাঝের সর্ববৃহৎ মেহরাবটিই বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণী থেকে জানা যায়, এ মসজিদ নির্মাণের পর থেকেই চট্টগ্রামের ধর্মপ্রাণ  মুসলমানদের কাছে তীর্থস্থান (ছানী কাবা) হয়ে উঠে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধররগণ এ মসজিদের খতিব হিসেবে নিযুক্ত হতেন। যার ধারাবাহিকতা এখনো রয়েছে। রোজা, ফিতরা এবং ঈদের চাঁদ দেখার প্রশ্নে এ মসজিদের ফয়সালা চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ মেনে চলতেন। প্রতি শুক্রবার চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুসল্লিরা এসে জুমার নামাজ আদায় করতেন। পবিত্র মাহে রমজানের শেষ জুমায় কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকেও মানুষের সমাগমের নজির রয়েছে। ১৯৪২ সালে আলে রাসূল আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই মসজিদে রমজান মাসের খতমে তারাবীতে ইমামতি করেছিলেন। বর্তমানে এ মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আল্লামা সৈয়্যদ আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরি আল মাদানি এবং নিয়মিত দায়িত্বে আছেন ৩ জন পেশ ইমাম, ২ জন মুয়াজ্জিন ও ৭ জন খাদেম।
এটি নির্মাণের প্রায় ৫৬ বছর পর ১৭২৩ সালে নবাব ইয়াসিন খাঁ এর সন্নিকটস্থ দক্ষিণ-পূর্ব দিকের একটি টিলার ওপর 'কদম রসূল' নামক আরেকটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন। কালক্রমে এ মসজিদের চেয়ে কদম রসুল মসজিদটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে মসজিদটি মুসল্লিদের গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এক পর্যায়ে লোকশূন্য হয়ে পড়লে এই সুযোগে ১৭৬১ সাল থেকে দীর্ঘ ৯৪ বছর  তৎকালীন শাসক ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ মসজিদটিকে তাদের গোলাবারুদ রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে। অতঃপর ১৮৮৫ সালে এ অঞ্চলের তৎকালীন ডেপুটি কালেক্টর নবাব হামিদুল্লাহ খাঁর বিশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মসজিদটি মুসলমানদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।


মসজিদ সূত্রে জানা যায়, এ মসজিদে দৈনিক প্রায় ২ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। প্রতি শুক্রবার গড়ে ৮ হাজার মানুষ জুমার নামাজ আদায় করেন। পবিত্র রমযান মাসের জুমআতুল বিদায় ২০ থেকে ২৩ হাজার মানুষের বিশাল জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার নজিরও রয়েছে। সুদীর্ঘ দুই দশক ধরে প্রতি বছর রমযান মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নগরের বিত্তবান শিল্পপতিদের অনুদানে প্রায় ৩ হাজার মানুষের জন্য  ইফতারের বিশাল আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন শত শত মানুষ। উল্লেখ্য, অনেক সময় মুসলিম রোযাদার ছাড়াও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও ইফতারে শরিক হন। তাদের মতে, এই মসজিদে ইফতার গ্রহণ করলে সুফল লাভ করা যায়। 

ঐতিহাসিক এই মসজিদের আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা মার্কেট এটির শোভা বর্ধনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে । অথচ একসময়  বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পর্যটকগণ এটি পরিদর্শন করে মুগ্ধ হতেন। মুসল্লিরা জানান, এ মসজিদের উন্নয়নে এ পর্যন্ত  হাত দেয়া হয়নি। বর্ষাকালে মূল ভবনের ছাদ চুষে পানি পড়ে। ইফা সূত্রে জানা যায়, কুয়েতের অর্থায়নে দেড়শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে মসজিদটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও নানা জটিলতায় উন্নয়ন কাজ থমকে আছে।




কোন মন্তব্য নেই

 

Blogger দ্বারা পরিচালিত.