কবি গোলাম মোস্তফা : বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবি
মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
“তব নব প্রভাতের রক্তরাগখানি
মধ্যাহ্নে জাগা যেন জ্যোতির্ময়ী বাণী।”
ইসলাম ও মুসলিম ঐতিহ্যের বিচিত্র রূপ যে সকল প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিক আধুনিক বাংলা কাব্য-সাহিত্যে ইসলামী গান ও কবিতার মধ্য দিয়ে সুনিপুণভাবে দক্ষ শিল্পীর মত চিত্রিত করে দিশারী রূপে স্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের মাঝে কবি গোলাম মোস্তফা অন্যতম। তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চিন্তাধারায় ইসলামী তাহযীব ও তামাদ্দুনের প্রকাশ ঘটেছে।
জম্ম ও বংশ পরিচয়:
ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে ১৮৯৭ সালে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা জম্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী গোলাম রাব্বানী ও মাতা বিবি শরীফুন্নেসা। তাঁর পিতৃপুরুষ বিশেষত পিতা ও পিতামহ কাজী গোলাম সরওয়ার সাহিত্যানুরাগী-ফারসী ও আরবী ভাষায় পন্ডিত এবং কবি ও সাহিত্যিক হিসাবে তৎকালে সুখ্যাতি ছিল।
শিক্ষা জীবন :
কবি গোলাম মোস্তফার শিক্ষা জীবনের সূচনা হয় চার বছর বয়সে নিজ গৃহে ও পার্শ্ববর্তী দামুকদিয়া গ্রামের পাঠশালায়। কিছুদিন পরে তিনি ফাজিলপুর গ্রামের পাঠশালাতে ভর্তি হন। দু’বছর এই পাঠশালায় বিদ্যা অর্জনের পর ভর্তি হলেন শৈলকূপা হাই স্কুলে। ১৯১৪ সালে এই স্কুল থেকে বিশেষ কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন, দৌলতপুর কলেজ থেকে ১৯১৬ সালে আই,এ এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯১৮ সালে বি,এ পাশ করেন। পরে ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ থেকে বি. টি ডিগ্রীও লাভ করেন।
কর্ম জীবন :
কবি গোলাম মোস্তফা শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে পছন্দ করেন এবং ১৯২০ সালের জানুয়ারী মাসে ২৪ পরগনা জেলার ব্যারাকপুর সরকারী হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্যদিয়ে কর্ম জীবনের সূচনা করেন। বি,টি পাশ করে ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা হেয়ার স্কুলে শিক্ষকতা করেন। অত:পর কলকাতা মাদ্রাসায় বদলী হন। শিক্ষকতা জীবনে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করার পর ১৯৪৬ সালে প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হয়ে ফরিদপুর জেলা স্কুলে যোগদান করেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর শিক্ষকতা করার পর ১৯৫০ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকার গঠিত ভাষা সংস্কার কমিটির সচিব ছিলেন। গীত রচনা, কাব্য, উপন্যাস, জীবনী, অনুবাদসহ সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তাঁর স্বছন্দ পদচারণা ছিল।
সাহিত্য কর্ম :
মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত কবি গোলাম মোস্তফার অবদান বাংলা সাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত। স্কুল জীবনেই এই কবির সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৯১৩ সালে দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা কালে "আদ্রিয়ানোপল উদ্ধার' কবিতাটি মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর পরবর্তী গ্রন্থাবলীর মধ্যে ‘হাসনাহেনা’, ‘খোশরোজ’, ’সাহারা’, ‘বুলবুলিস্তান’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ ও ‘রূপের নেশা’, ‘ভাঙ্গাবুক’, ‘এক মন এক প্রাণ’ ইত্যাদি উপন্যাসগুলি বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আরবী ও উর্দু সাহিত্য হতে ‘ইখওয়ানুস সাফা’, ‘মুসাদ্দাস-ই-হালী’, ‘কালাম-ই-ইকবাল’, ‘শিকওয়া’ ও ‘আল-কুরআন’ গ্রন্থগুলি ভাষান্তরিত করে বাংলা সাহিত্যকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন।
কবি গোলাম মোস্তফার রচিত ‘বিশ্বনবী’ রাসুলুল্লাহর শ্রেষ্ঠ জীবনী গ্রন্থাবলীর অন্যতম। এই অমর গ্রন্থখানি গদ্যে রচিত হলেও সে গদ্যও কবিতার মত ছন্দময় এবং মধুর। গ্রন্থটিতে হৃদয়ের আবেগ, আন্তরিক অনুভূতি যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তার তুলনা আমাদের বাংলা সাহিত্যে নিতান্তই বিরল। এর পরবর্তীতে তিনি কোরআনিক ঘটনার অমিত্রাক্ষর ছন্দে ‘বনি আদম’ নামে একটি মহাকাব্য লিখেছিলেন। যা বাংলা সাহিত্যে এক অমর ও অক্ষয় কীর্তি।
সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। গায়ক ও গীতিকার হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বিশেষ করে ইসলামী গান, গজল ও মিলাদ মাহফিলের বিখ্যাত ‘কিয়ামবাণী’ (রসুল আহবান বাণী) রচনায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর অনেকগুলি গান আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠেও রেকর্ড হয়েছিল। এছাড়া নিজের কণ্ঠেও তিনি বেশ কয়েকটি গান রেকর্ড করেছিলেন। সত্তরের দশকে এদেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গিতের পূর্বে যে গীত পরিবেশন করা হতো, তা তাঁরই সুরা ফাতেহার কাব্যানুবাদ, সেই বিখ্যাত মোনাজাত কবিতা “অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি, বিচার দিনের স্বামী” যা আজো মানুষের কাছে সমভাবে জনপ্রিয়।
আর তাঁর এ অসাধারণ কাব্য প্রতিভা ও ছান্দিক কারুকর্মে বিমুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ হিন্দু কবি সাহিত্যিক গোলাম মোস্তফাকে আধুনিক কবি রূপে প্রথম স্বীকৃতি দেন।
স্বীকৃতি সম্মাননা:
সাহিত্য ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য ১৯৫২ সালে যশোর সাহিত্য সংঘ তাকে "কাব্য সুধাকর' এবং তৎকালিন পাকিস্তান সরকার ১৯৬০ সালে তাকে "সিতারা-ই-ইমতিয়াজ' উপাধিতে ভূষিত করেন ।
ইন্তেকাল:
বাংলা সাহিত্যের সাধক কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর শেষ জীবনের কয়েক বছর ঢাকা শান্তি নগরস্থ নিজ গৃহে (মোস্তফা মঞ্জিল) অতিবাহিত করেন। বেশ কিছু দিন রোগ যন্ত্রণা ভোগ করার পর কবি ১৯৬৪ সালের ১৩ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে উচু মকাম দান করুক। আমীন!
লিখক:আরবি প্রভাষক, রাণীরহাট আল-আমিন হামেদিয়া ফাযিল মাদরাসা। পরিচালক, গাউছুল আজম রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।
কোন মন্তব্য নেই