মহামারী থেকে পরিত্রাণের ব্যবস্থাপত্র
মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম ভবিষ্যতবাণী করেন:
‘আমার উম্মতের এক শ্রেণির লোক মদের নাম পরিবর্তন করে মদ পান করবে। তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্রের বাজনা বাজতে থাকবে। তাদের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা জমিন ধ্বসিয়ে দেবেন। তাদেরকে বানর ও শুকরে পরিণত করবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০২০)
অন্যত্র হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
‘কিয়ামতের আগের ছয়টি নিদর্শন গণনা করে রাখো। আমার মৃত্যু, অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়, অতঃপর তোমাদের মধ্যে বকরির পালের মহমারীর মতো মহামারী ছড়িয়ে পড়বে, সম্পদের প্রাচুর্য, এমনকি এক ব্যক্তিকে একশ দিনার দেওয়ার পরও সে অসন্তুষ্ট থাকবে। অতঃপর এমন এক ফিতনা আসবে, যা আরবের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করবে। অতঃপর যা তোমাদের ও বনি আসফার বা রোমকদের মধ্যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি সম্পাদিত হবে। অতঃপর তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং ৮০টি পতাকা উড়িয়ে তোমাদের বিপক্ষে আসবে; প্রতিটি পতাকার নিচে থাকবে ১২ হাজার সৈন্য।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১৭৬)
উপরোক্ত হাদীস শরীফের আলোক অনুধাবন করা যায় যে, মানবজাতি যখন অধিকহারে মাদকে ডুবে যাবে, গান বাজনা ও অশ্লীল কথাবার্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করবে, তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসতে থাকবে। হাদিসের ভাষ্যের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে মিলে যায়। বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে প্রাচুর্য ও ধনাঢ্যতা বেড়েই চলছে। নতুন নতুন রোগের প্রকাশ হচ্ছে, যেগুলো বন্ধ করার সাধ্য কারও নেই। ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির আগুন, ভাইরাস, মানববিকৃতির মতো নিত্য নতুন মহাদুর্যোগ আমাদের গুনাহ ও নাফরমানিরই ফল। আস্ট্রেলিয়ার আগুন, ইরান ও সিরায়ায় ভূমিকম্প, চীনের ভাইরাস হলো আল্লাহ প্রদত্ত আজাব, যা আজ সারা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে।
এসব আজাব থেকে পরিত্রাণের একটাই উপায়, গুনাহ ও নাফরমানি ত্যাগ করা। ইরশাদ হচ্ছে:
হে আমার সম্প্রদা! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁরই নিকটতাওবা কর। তিনি তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা প্রেরণ করবেন। (সুরা হুদ: আয়াত- ৫২)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা রোগের প্রতিষেধক সম্পর্কে ঘোষণা করেন,
আপনার পালনকর্তা মৌমাছিকে আদেশ দিলেন পাহাড়, গাছ ও উঁচু চালে আবাসস্থল তৈরি কর, তারপর সব ধরনের ফল থেকে খাও আর আপন পালনকর্তার উম্মুক্ত পথসমূহে চলাচল কর। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা নাহল : আয়াত ৬৮-৬৯)
এ প্রসঙ্গে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:
‘এমন কোনো রোগ নেই যা আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেননি। আর তিনি এর প্রতিষেধকও সৃষ্টি করেছেন’
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন,
‘তিনটি জিনিসের মধ্যে রোগমুক্তি আছে-- মধু পানে,- শিঙ্গা লাগানোয় এবং- আগুন দিয়ে দাগ লাগানোয়। তবে আমি আমার উম্মাতকে আগুন দিয়ে দাগ দিতে নিষেধ করছি।’ (বুখারি)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেছেন:
‘কালোজিরা ব্যবহার কর। কালো জিরায় রয়েছে ‘শাম’ ছাড়া প্রত্যেক রোগের প্রতিষেধক। আর ‘শাম’ হলো মৃত্যু।’ (বুখারি)
এছাড়া ২ হাজার বছর ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণাও দেখা গেছে যে, কালোজিরায় বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও এন্টি ভাইরাসের উপাদান বিদ্যমান।
হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন সরকারে দো আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
যে ব্যক্তি প্রত্যেক মাসে তিন দিন সকালবেলা মধু পান করবে যে যে কোনো মারাত্মক মৌসুমি রোগে আক্রান্ত হবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)
হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত প্রতিদিন এক চামচ করে মধু পান করা। এটা মানুষকে করোনাসহ যে কোনো মহামারি থেকে মুক্তি দেবে। সুতরাং প্রাণঘাতী ব্যাধি করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও প্রতিকারে হাদিসের নির্দেশনা মেনে মধু ও কালোজিরা খাওয়া যেমন জরুরি। আবার মহামারি আক্রান্ত হলে হাদিসে ঘোষিত আমল সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও নাস পড়ে হাতে ঝাড়-ফুঁক দিয়ে শরীরে মালিশ করাও জরুরি।
করোনাভাইরাস থেকে বেঁচে থাকতে হাদিসে ঘোষিত এ দোয়াগুলোর আমলও করা যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
‘যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় তিনবার বলবে-
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ : ‘বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদ্বি ওয়ালা ফিসসামায়ি, ওয়া হুয়াসসাম উল আলিম।’সকাল হওয়া পর্যন্ত ওই ব্যক্তির উপর আকস্মিক কোনো বিপদ আসবে না। আর যে ব্যক্তি সকালে তিনবার এ দোয়া পড়বে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ওপর কোনো বিপদ আসবে না।’ (জামে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ)
অর্থ : ‘আল্লাহর নামে, যার নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো বস্তুই ক্ষতি করতে পারে না, তিনি সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী।’
اَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَ الْجُنُوْنِ وَ الْجُذَامِ وَمِنْ سَىِّءِ الْاَسْقَامِ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাচি ওয়াল জুনুনি ওয়াল ঝুজামি ওয়া মিন সায়্যিয়িল আসক্বাম।’ (সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজি)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأَخْلاَقِ وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ وَ الْاَدْوَاءِ
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন মুনকারাতিল আখলাক্বি ওয়াল আ’মালি ওয়াল আহওয়ায়ি, ওয়াল আদওয়ায়ি।’ (জামে তিরমিজি)
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
হে মুহাজিরগণ! তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও। যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগরোগের (ইঁদুরের মাধ্যমে) প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। যখন কোনো জাতি ওজন ও পরিমাপে কারচুপি করে, তখন তাদের উপর নেমে আসে দুর্ভিক্ষ, কঠিন বিপদ মুসিবত, এবং যখন জাকাত আদায় না করে, তখন আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেয়া হয়। যদি ভূপৃষ্ঠে চতুষ্টদ জন্তু ও নির্বাক প্রাণী না থাকতো তাহলে আর কখনো বৃষ্টিপাত হতো না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০১৯)
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
‘গোনাহের কারণে মানুষের রিজিক কমে যায়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০২২)অন্যত্র ইরশাদ করেছেন:
এটি আল্লাহর গজব বা শাস্তি বনি ইসরায়েলের এক গোষ্ঠীর ওপর এসেছিল, তার বাকি অংশই হচ্ছে মহামারী। অতএব, কোথাও মহামারী দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা ছেড়ে চলে এসো না। আবার কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করে থাকলে, সে জায়গায় গমন করো না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৫; সহিহ বুখারী, ৫/২১৬৩; সহিহ মুসলিম, ৪/১৭৩৮, ১৭৩৯)
এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) প্রায় দেড় হাজার বৎসর পূর্বে সংক্রমন প্রতিরোধে বিচ্ছিন্নকরণ (quarantine) ব্যবস্থার নির্দেশনা প্রদান করেন।তাই এ ধরনের রোগের প্রকোপ যেখানে দেখা দেবে, সেখানে যাতায়াত না করাই উচিত।
আসুন! সকলে মহান প্রতিপালকের দরবারে আপন পাপের ক্ষমা চেয়ে ইস্তেগফার ও দরুদ পড়ি এবং নিয়মিত উপরোক্ত আমল করে নিজেকে হিফাজত করি।
লিখক: আরবি প্রভাষক
রাণীরহাট আল-আমিন হামেদিয়া ফাযিল (ডিগ্রী) মাদরাসা।
কোন মন্তব্য নেই