ওলিকুল সম্রাট
মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
শরিয়ত ও তরিকত জগতের সম্রাট হুযূর শাহেনশাহে বাগদাদ সাইয়্যিদুনা আবদুল কাদের জিলানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ১০৭৭ খ্রিষ্টাব্দে/ ১ রমজান ৪৭০ হিজরীতে ইরানের অন্তর্গত জিলান জেলার কাসপিয়ান সমুদ্র উপকূলের নাইদ নামক স্থানে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর মাতার নাম সৈয়্যদা উম্মুল খায়ের ফাতেমা এবং পিতা ছিলেন সৈয়্যদ মুসা জঙ্গী দোসত রহমাতুল্লাহি আলাইহিমা। বাবার দিক থেকে হাসানি আর মাতার দিক থেকে হুসাইনি ছিলেন তিনি।
তাঁর ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা ও আদর্শ যুগে যুগে সঠিক পথের দিশা দিয়ে আসছে। অপরিসীম জ্ঞানের পরিধি, ভাষার মাধুর্যতায় মানব সমাজকে ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত করেছেন। ৫২১ হিজরীর ১৬ শাওয়াল রোজ মঙ্গলবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নযোগে বলেন, হে আবদুল কাদির! তুমি মানুষকে কেন আল্লাহর পথে আহ্বান করছো না। মানুষকে কেন বঞ্চিত করছো। আবদুল কাদের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি তো অনারবী। যদি ইরাকের লোকজন তিরস্কার করেন। তাৎক্ষণিক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আবদুল কাদের তুমি মুখ খোল। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু একটা পড়ে ৬ বার মুখের মধ্যে ফুক দিলেন এবং রাসূলুল্লাহর মুখের লালা মুবারক তাঁর মুখে লাগিয়ে দিলেন। অতপর বললেন, মানুষকে "হিকমত এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তোমার প্রভুর পথে পরিচালিত করো"। (সূরা নাহল, আয়াত-১২৫)। এর পর থেকে তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য বাদশা থেকে দরিদ্র এমনকি ভিন্ন জাতির মানুষও জড়ো হতো। অতঃপর ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিতে কুণ্ঠাবোধ করত না। একদা বাগদাদের তৎকালীন জগৎ বিখ্যাত দুইজন হাফেজুল হাদীস,আল্লামা আবদুর রহমান ইবনে জুযী এবং আহমদ ইবনে হামেল রহমাতুল্লাহি আলাইহিমাএকে অপরকে বললেন, আমরা আরবী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের মজলিশে তেমন লোক সমাগম হয় না, কিন্তু ইরান থেকে আগন্তুক আজমী আবদুল কাদের জিলানীর মাহফিলে লক্ষাধিক মানুষ হয়,ব্যাপার কী? তাঁরা উভয়ে সিদ্ধান্ত নিল-একদিন তাঁর মজলিশে ছদ্মবেশে তাঁরা উপস্থিত হয়ে বিষয়টি অবলোকন করবেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাঁরা উভয়ে হুযূরের মাহফিলে উপস্থিত হলেন। গাউসে পাক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু স্বীয় আসনে বসে তাকরীর আরম্ভ করলেন। কুরআনুল করিমের একটি আয়াত তেলাওয়াত করে তার ধারাবাহিক বারটি তাফসীর করলেন। এ তাফসীর শুনে তাঁরা পরস্পর বলতে লাগল- এগুলো আমাদের জানা আছে। কিন্তু যেই মাত্র তের -বিশ নম্বর তাফসীর করলেন,তাঁরা হতভম্ব হয়ে বলল, আমরা বিশ্বের যত রকম তাফসীর আছে সব পরেছি, কিন্তু এ তাফসীর তো কখনো পাইনি। এ তাফসীর আমাদের জ্ঞানের বাইরে। অতঃপর তাঁরা উভয়ে হুযূরের চরণে লুটিয়ে পড়লেন এবং ঘোষণা দিলেন, হে গাউস! আপনি শুধু ওলীদের সম্রাট নয় বরং আলেমকুলেরও সম্রাট। ইমাম ইবনে জুযী আরো বলেন, গাউসে পাকের মুরীদ-ভক্তরা অন্যান্য তরীকার মুরীদদের থেকে শতগুণ উত্তম।
হুযূর গাউসে পাক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মাতৃগর্ভজাত ওলী হওয়া সত্ত্বেও কঠোর রিয়াজতে মগ্ন থাকতেন। তিনি একাধারে ৪০ বছর পর্যন্ত ইশার নামাজের অযু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। তিনি রাতের একটা সময় জিকির ও মোরাকাবা করে কাটাতেন। যৌবনের অধিকাংশ সময় রোজা রেখে কাটিয়েছেন। যখন নফল নামাজ আদায় করতেন সুরা ফাতেহার পর সূরা আর রহমান, সূরা মুজাম্মিল কিংবা সুরা ইখলাস পড়তেন। তন্দ্রার ভাব আসলে দেখে দেখে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। একদা এক মরুপ্রান্তরে তিনি ভ্রমণ করছিলেন। ইবাদত-বন্দেগি ও ধ্যানসাধনার এক বিশেষ ক্ষণে অদৃশ্য কোনো স্থান থেকে আওয়াজ আসে, ‘হে আবদুল কাদের! আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। সাধনার মাধ্যমে তুমি আজ এমন একপর্যায়ে উপনীত হয়েছ যে, আমি আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেছি। অতএব, এখন থেকে শরিয়তের কোনো বিধান তোমার ওপর বাধ্যতামূলক নেই। তুমি ইবাদত কর বা না কর, এতে কিছু আসে যায় না। যে কোনো ধরনের কাজে তুমি এখন থেকে স্বাধীন। ’ এ ধরনের কথা শুনে হযূর গাউসে পাক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু পড়লেন "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযিম" পড়ার সাথে সাথে অদৃশ্য আওয়াজটি বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, ‘হে অভিশপ্ত শয়তান, তোর কুমন্ত্রণা থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। তোর এ প্রস্তাব শুনেই আমি বুঝতে পেরেছি যে, এ তোর ভয়াবহ কৌশল। আমাকে পথচ্যুত করার এক মারাত্মক কূটচাল। কেননা, সাধনার কোনো পর্যায়েই ইবাদত-বন্দেগির দায়িত্ব কারও ওপর থেকে তুলে নেওয়া হয় না। শরিয়ত অমান্য করার নির্দেশ আল্লাহ কখনো কোনো ব্যক্তিকে দেন না। তোর আওয়াজ শোনামাত্রই আমি বুঝতে পেরেছি যে, এমন বাণী আল্লাহর পক্ষ থেকে আসতে পারে না। এ নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল। ’ এ কথা শুনে শয়তান বলল, ‘এ ধরনের কথা বলে এর আগে আমি এই প্রান্তরেই অন্তত ২৭ জন সাধকের সর্বনাশ করেছি। আজ আপনি নিজ প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও উচ্চপর্যায়ের সাধনাবলেই রক্ষা পেয়ে গেলেন, হে যুগশ্রেষ্ঠ ওলি! ’ তখন হুযূর শাহেনশাহে বাগদাদ বললেন, না, আমার ইলম আমাকে রক্ষা করে নি, বরং নবী সরকারে দোজাহার প্রেম-মহব্বত ও আল্লাহর খাস রহমত ছাড়া ধূর্ত প্রতারক শয়তান থেকে বেঁচে থাকার কোনো শক্তি ও ক্ষমতা আমার নেই। শুধু ইলমই যদি রক্ষা করতেো- তাহলে তোমার অগাধ ইলমই তোমাকে আল্লাহর অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে পারতো। তোমার ইলম-আমল সবই ছিল, ছিে না শুধু আদম নবীর প্রেম। তাই তুমি ধংস হয়েছ। (সীরাতে গাউসুল আজম)
তিনি কাব্য, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ভূগোল বিষয়েরও পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর রচিত বহু গ্রন্থ রয়েছে। এসব গ্রন্থের মধ্যে 'ফতহুল গায়েব গুনিয়াতুত তালেবীন', 'ফতহুর রববানী', 'কাসিদায়ে গাওসিয়া' উল্লেখযোগ্য।
স্রষ্টার চূড়ান্ত দীদার লাভের উদ্দেশ্যে ৫৬১ হিজরি সনের ১১ রবিউস সানি রোজ সোমবার ৯১ বছর বয়সে ইহজগৎ ত্যাগ করেন। বর্তমানে ইরাকের বাগদাদ শহরে তাঁর মাজার শরিফ রয়েছে। বড়পীর সাহেবের এই ওফাতের দিবস সারা বিশ্বের মুসলমানরা গুরুত্বের সঙ্গে 'ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম' নামে পালন করে থাকে।( ফতহুর রববানী, বড়পীরের পরিচয়)
লিখক: আরবি প্রভাষক, রাণীরহাট আল-আমিন হামেদিয়া ফাযিল মাদরাসা
খতিব,রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ জামে মসজিদ,রাঙ্গুনিয়, চট্টগ্রা।
কোন মন্তব্য নেই