বিশুদ্ব উচ্চারণ কুরআন তেলাওয়াতের পূর্ব শর্ত
সৃষ্টিকূলের ওপর যেমন স্রষ্টার সম্মান ও মর্যাদা অপরিসীম, তেমনি সকল বাণীর ওপর মহাগ্রন্থ আল কুরআনের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অতুলনীয়।অন্ধকারাচ্ছন্ন বিভীষিকাময় জাহেলি সমাজে কুরআন এনেছিল আলোকময় সোনালি সকাল। মানুষের মুখ থেকে যা উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে এ কুরআন পাঠ সর্বাধিক উত্তম। আলোচ্য নিবন্ধে বিশুদ্ধ পন্থায় কুরআন তেলাওয়াত প্রসঙ্গে আলোকপাত করার প্রয়াস পেলাম।
আমিরুল মুমেনীন হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, 'হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা প্রত্যেকেই এমনভাবে কুরআন পড় যেভাবে তোমাদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।' (ফাজায়েলুল কোরআন, ইমাম কাসেম ইবনে সালাম, পৃ. ৩৬১) অর্থাৎ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে যেভাবে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং পরবর্তী উম্মতকে সাহাবাগণ যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন আর উক্ত পরম্পরা যেভাবে শুদ্ধভাবে চলে আসছে, সেভাবেই পড়তে হবে। তাই প্রতিটি হরফ স্বীয় মাখরাজ থেকে সিফাতে লাজেমাসহ উচ্চারণ করে মদ-গুন্নাহ আদায় করেই কুরআন পড়তে হবে। এই কোরআন পড়ার জন্য কিছু নিয়ম-কানুন তথা ব্যাকরণ রয়েছে , কুরআনের পরিভাষায় এই নিয়ম-কানুনকে বলা হয় তারতিল। ‘তারতিল’ মানে মদ ও গুন্নাহ পরিপূর্ণভাবে আদায় করে, ধীর- স্থীরে কোরআন মজীদ পড়া। ইরশাদ হচ্ছে-
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
কুরআন তিলাওয়াত কর ধীরস্থির ভাবে, স্পষ্টরূপে। (সূরা মুযযাম্মিল,আয়াত : ৪) হাদীস শরীফে রয়েছে-
زينوا القرآن بأصواتكم
অর্থাৎ সুন্দর সূরের মাধ্যমে কুরআনকে (এর তিলাওয়াতকে) সৌন্দর্যমণ্ডিত কর। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ১৪৬৮)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম ইরশাদ করেছেন, (কিয়ামতের দিন) কুরআনের তিলাওয়াতকারী বা হাফেজকে বলা হবে-
اقْرَأْ، وَارْتَقِ، وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا، فَإِنَّ مَنْزِلَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا.
তিলাওয়াত করতে থাক এবং উপরে উঠতে থাক। ধীরে ধীরে তিলাওয়াত কর, যেভাবে ধীরে ধীরে দুনিয়াতে তিলাওয়াত করতে। তোমার অবস্থান হবে সর্বশেষ আয়াতের স্থলে যা তুমি তিলাওয়াত করতে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস :১৪৬৪; জামে তিরমিযী, হাদীস :২৯১৪)
এই ধীরস্থির বা তারতীলের সাথে তিলাওয়াত কেমন হবে তা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখিয়ে গেছেন, শিখিয়ে গেছেন। হযরত উম্মে সালামা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামায ও তিলাওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তাঁর তিলাওয়াত ছিল-
قِرَاءَةً مُفَسَّرَةً حَرْفًا حَرْفًا
প্রতিটি হরফ পৃথক পৃথকভাবে উচ্চারিত। অর্থাৎ কোনো জড়তা, অস্পষ্টতা ও তাড়াহুড়া ছিল না।( জামে তিরমিযী, হাদীস: ২৯২৩) তাই কোরআন তাড়াতাড়ি বা দ্রুতগতিতে না পড়াই শ্রেয়। ধীরে ধীরে প্রতিটি শব্দ মাখরাজের সহিত সুন্দরভাবে মুখে উচ্চারণ করে কুরআন তেলাওয়াতের বিশেষ মাহাত্ম রয়েছে। তা হলো, এক একটি আয়াত পড়ে থামলে বা বিরতি নিলে মন আল্লাহর বাণীর মর্মার্থ ও তার দাবীকে পুরোপুরি উপলদ্ধি করতে পারবে এবং তার বিষয়বস্তু দ্বারা প্রভাবিত হবে। উচ্চারণের ক্ষেত্রে দু’টি বিষয়ের ওপর খেয়াল রাখতে হবে। একটি হলো মাখরাজ বা উচ্চারণ স্থান। প্রতিটি ধ্বনি বাক প্রত্যঙ্গের ঠিক কোন স্থান থেকে উচ্চারিত হবে সেটি জানতে হবে। আরেকটি হলো- সিফাত বা শব্দের অবস্থা ও গুণাবলি অনুযায়ী উচ্চারণ করা।কোরআন তেলাওয়াতের এই ব্যাকরণকে উসূলের পরিভাষায় তাজবিদ বলা হয়। তাজবিদ জানার কোনো বিকল্প নেই। কোরআনকে সুন্দর করে সুরেলা কণ্ঠে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে কোরআন দেখে দেখে পড়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণটা হলো, কোরআনের আয়াতের দিকে তাকালে এবং কানে সেই দেখা আয়াতের তেলাওয়াত শুনলে চোখ এবং কানের ওপর তার প্রভাব পড়ে। সেই প্রভাব চূড়ান্তভাবে অন্তরে গিয়ে আসন গাড়ে। সূফি আলেমরা বলেছেন, দেখে দেখে কুরআন তেলাওয়াত করলে চোখের অসুখ বা ব্যাথা বেদনা ভালো হয়ে যায়।
সাহাবায়ে কেরামের তিলাওয়াতের বৈশিষ্ট্যও এমনই ছিল। ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত করতেন তাঁরা। নিজেরা করতেন, অন্যদেরকেও তাগিদ দিতেন।
আলকামা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাচ্ছিলেন। তিনি সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। (কিন্তু তিনি কিছুটা দ্রুত পড়ে যাচ্ছিলেন) তখন ইবনে মাসউদ রাযি. বললেন, আমার বাবা-মা তোমার উপর কুরবান হোক! ধীরস্থিরভাবে তারতীলের সাথে তিলাওয়াত কর। এটা কুরআনের (তিলাওয়াতের) ভূষণ। (মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল, পৃ. ১৩১)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে এক ব্যক্তি বলল,আমি এক রাকাতেই মুফাস্সালের [সূরা ক্বাফ থেকে সূরা নাস পর্যন্ত। (ফাতহুল বারী ২/২৫৮)] সব সূরা পড়ে নিই। হযরত ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তখন বললেন, এটা তো কবিতা আওড়ানোর মত পাঠ করা। অনেক মানুষ কুরআন তিলাওয়াত করে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালির নিচেও যায় না। অথচ কুরআন তিলাওয়াত তখনই (পরিপূর্ণ) উপকারী হয় যখন তা অন্তরে গিয়ে বসে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৮২২) অন্যত্র রয়েছে, "তোমরা কবিতা পাঠের মত গড়গড় করে দ্রুত কালামে পাক তিলাওয়াত করো না এবং নষ্ট খেজুর যেমন ছুড়ে ছুড়ে ফেলা হয় তেমন করে পড়ো না বরং এর বিস্ময়কর বাণী ও বক্তব্যগুলোতে এসে থেমে যাও, হৃদয়কে নাড়া দাও। এ ভাবনা যেন না থাকে যে, এ সূরা কখন শেষ হবে!" (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস :৮৮২৫) আল্লামা যারকাশী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তারতীল মানে কুরআনের শব্দগুলো ভরাট উচ্চারণে পাঠ করা এবং হরফগুলো স্পষ্ট করে উচ্চারণ করা। অন্যথায় এক হরফ আরেক হরফের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। কারো কারো মতে এটা তারতীলের সর্বনিম্ন মাত্রা।
কুরআন তেলাওয়াতের আদাব
কোরআন পাঠ করতে হয় যথাযথ ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আদব সহকারে। এক্ষেত্রে শিষ্টতাপূর্ণ কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। এগুলোর কোনোটা বাহ্যিক আবার কোনো কোনোটা অভ্যন্তরীণ। নিম্নে তন্মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো—
প্রথম আদব : নিয়ত শুদ্ধ করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের ওপর আগুনের শাস্তি কঠোর করা হবে বলে জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ওই ক্বারী, যিনি ইখলাসের সঙ্গে কুরআন তিলাওয়াত করতেন না। (জামে তিরমিযি, হাদিস : ২৩৮২; সহিহ ইবন হিব্বান, হাদিস : ৪০৮)
দ্বিতীয় আদব : পবিত্র হয়ে অজু অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা। অজু ছাড়াও মুখস্থ কুরআন পড়া যাবে, তবে তা অজু অবস্থায় পড়ার সমান হতে পারে না। ইরশাদ হচ্ছে - ‘পবিত্র সত্তা ছাড়া কেউ এ কোরআন স্পর্শ করতে পারে না। ’(সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৭৯)
তৃতীয় আদব : কুরআন তিলাওয়াতের আগে মিসওয়াক করা। আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের মুখগুলো কুরআনের পথ। তাই সেগুলোকে মিসওয়াক দ্বারা সুরভিত করো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৯১) তার মানে কোরআনের আধ্যাত্মিক গুণে যিনি সমৃদ্ধ হতে চান তার উচিত আত্মিক পবিত্রতা এবং আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করা।
চতুর্থ আদব : তিলাওয়াতের শুরুতে আউজুবিল্লাহ পড়া। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘সুতরাং যখন তুমি কুরআন পড়বে, তখন আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাও।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯৮)
পঞ্চম আদব : বিসমিল্লাহ পড়া। তিলাওয়াতকারীর উচিত সূরা তাওবা ছাড়া সব সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সূরা শেষ করে বিসমিল্লাহ বলে আরেক সূরা শুরু করতেন। শুধু সূরা আনফাল শেষ করে সুরা তাওবা শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ পড়তেন না।
ষষ্ঠ আদব : তারতিলের সঙ্গে (ধীরস্থিরভাবে) কূরআন পড়া। কারণ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন , ‘তোমরা তারতিলের সঙ্গে কুরআন তিলাওয়াত করো।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ৪)
সপ্তম আদব : সুন্দর করে মনের মাধুরী মিশিয়ে কুরআন পড়া। বারা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এশার নামাজে সূরা ত্বিন পড়তে শুনেছি। আমি তাঁর চেয়ে সুন্দর কণ্ঠে আর কাউকে তিলাওয়াত করতে শুনিনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৫৪৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৬৭)
অষ্টম আদব : সুর সহকারে কুরআন তিলাওয়াত করা। এটি সুন্দর করে কোরআন তিলাওয়াতের অংশ। হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘সে আমার উম্মত নয়, যে সুর যোগে কুরআন পড়ে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৫২৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৭১)
নবম আদব : রাতে ঘুম পেলে বা ঝিমুনি এলে তিলাওয়াত থেকে বিরত থাকা। আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন , ‘যখন তোমাদের কেউ রাতে নামাজ পড়ে, ফলে তার জিহ্বায় কুরআন এমনভাবে জড়িয়ে আসে যে সে কী পড়ছে তা টের পায় না, তাহলে সে যেন শুয়ে পড়ে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৮৭২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৮২১৪) অর্থাৎ তার উচিত এমতাবস্থায় নামাজ না পড়ে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়া, যাতে তার মুখে কুরআন ও অন্য কোনো শব্দের মিশ্রণ না ঘটে এবং কুরআনের আয়াত এলোমেলো হয়ে না যায়।
দশম আদব : ফজিলতপূর্ণ সূরাগুলো ভালোভাবে শিক্ষা করা এবং সেগুলো বেশি বেশি তিলাওয়াত করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কেউ কি রাত্রিকালে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ তিলাওয়াতে অক্ষম? তারা বলল, কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ কিভাবে পড়া যাবে! তিনি বলেন, ‘সুরা ইখলাস কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯২২; সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০১৫)
একাদশ আদব : ধৈর্য নিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা। যিনি অনায়াসে কোরআন পড়তে পারেন না, তিনি আটকে আটকে ধৈর্যসহ পড়বেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কুরআন পাঠে যে অভিজ্ঞ ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে, সে সম্মানিত রাসূল ও পুণ্যাত্মা ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকবে। আর যে ব্যক্তি তোতলাতে তোতলাতে সক্লেশে কুরআন তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দ্বিগুণ নেকি লেখা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৯৮)
দ্বাদশ আদব : কুরআন তিলাওয়াতের আরেকটি আদব হলো তিলাওয়াতের সময় ক্রন্দন করা। আল্লাহ তাআলা তিলাওয়াতের সময় ক্রন্দনরতদের প্রশংসা করে বলেন, ‘আর তারা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে।’ (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১০৯)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন, আমাকে তুমি তিলাওয়াত করে শোনাও। বললাম, আমি আপনাকে তিলাওয়াত শোনাব, অথচ আপনার ওপরই এটি অবতীর্ণ হয়েছে? তিনি বলেন, আমি অন্যের তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করি। অতঃপর আমি তাঁকে সূরা নিসা পড়ে শোনাতে লাগলাম। যখন আমি সূরা নিসার ৪১ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করলাম, তিনি বললেন, ব্যস, যথেষ্ট হয়েছে। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৫০; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯০৩) আয়াতটি হলো, ‘যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং তোমাকে উপস্থিত করব তাদের ওপর সাক্ষীরূপে, তখন কী অবস্থা হবে?’
হযরত কাসিম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একদা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার পাশ দিয়ে গমন করছিলেন। তিনি দেখেন, আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা একটি আয়াত বারবার আবৃত্তি করছেন আর কেঁদে কেঁদে দোয়া করছেন। আয়াতটি হলো, ‘অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়া করেছেন এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদের রক্ষা করেছেন।’ (সূরা তুর, আয়াত : ২৭)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন এ আয়াত তিলাওয়াত করেন, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেন। আয়াতটি হলো, ‘আর মৃত্যুর যন্ত্রণা অবশ্যই আসবে, যা থেকে তুমি পলায়ন করতে চাইতে।’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ১৯)
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন এ আয়াতটি পড়তেন, তখনই তিনি কান্নাকাটি করতেন। আয়াতটি হলো, ‘...আর তোমাদের মনে যা আছে, তা যদি তোমরা প্রকাশ করো অথবা গোপন করো, আল্লাহ সে বিষয়ে তোমাদের হিসাব নেবেন...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৪)
মূল কথা হলো, কোরআন তিলাওয়াতের সময় কান্নাকাটি করা এবং চোখে পানি আসা ঈমানের নিদর্শন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কুরআনের পাঠকদের মধ্যে ওই ব্যক্তির কণ্ঠ সর্বোত্তম, যার তিলাওয়াত কেউ শুনলে মনে হয় যে সে কাঁদছে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৩৯)
ত্রয়োদশ আদব : কুরআন তিলাওয়াতের আরেকটি আদব হলো এর মর্ম নিয়ে চিন্তা করা। এটিই তিলাওয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আদব। তিলাওয়াতের সময় চিন্তা-গবেষণা করাই এর প্রকৃত সুফল বয়ে আনে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সূরা ছ্বাদ, আয়াত : ২৯)
ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা লিখেছেন, তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করা অনুচিত। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘তিন দিনের কম সময়ে যে কুরআন খতম করবে, সে কুরআন বুঝবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৩৯৬)
যায়েদ বিন সাবেত রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে একজন জিজ্ঞেস করলো, সাত দিনে কুরআন খতম করাকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন? তিনি বলেন, এটা ভালো। অবশ্য আমি এটাকে ১৫ দিনে বা ১০ দিনে খতম করাই পছন্দ করি। আমাকে জিজ্ঞেস করো, তা কেন? তিনি বলেন, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি। যায়েদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, যাতে আমি তার স্থানে স্থানে চিন্তা করতে পারি এবং থামতে পারি।’ (মুয়াত্তা মালেক, হাদিস : ৪৭২)
চতুর্দশ আদব : তিলাওয়াতের সময় সিজদার আয়াত এলে সিজদা দেওয়া। সিজদার নিয়ম হলো, তাকবির দিয়ে সিজদায় চলে যাওয়া।
পঞ্চদশ আদব : যথাসম্ভব আদবসহ বসা। আর বসা, দাঁড়ানো, চলমান ও হেলান দেওয়া—সর্বাবস্থায় তিলাওয়াত করার অনুমতি রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে...।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৯১)
পঞ্চদশ আদাব: কুরআন তেলাওয়াত মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা। ইরশাদ হচ্ছে - ‘যখন কোরআন তোমাদের সামনে পড়া হয়, তা মনোযোগ সহকারে শোনো এবং নীরব থাকো, হয়তো তোমাদের প্রতিও রহমত বর্ষিত হবে। (সূরা আরাফ,আয়াত :২০৪)
বিশুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত শিক্ষা করার গুরুত্ব
রাসূলে আরবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করে ও অপরকে কুরআন শিক্ষা দেয়।' (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৫২) তিনি আরো ইরশাদ করেছেন, 'যারা সহি শুদ্ধভাবে কুরআন তেলাওয়াত করে, তারা নেককার সম্মানিত ফেরেশতাদের সমতুল্য মর্যাদা পাবে এবং যারা কষ্ট সত্ত্বেও কুরআন সহি শুদ্ধভাবে পড়ার চেষ্টা ও মেহনত চালিয়ে যায়, তাদের জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৫৮)
অপর বর্ণনায় রয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কুরআনের জ্ঞানী হবে, কিয়ামতের দিন সে সম্মানিত ফেরেস্তাদের সঙ্গে থাকবে। আর যে কুরআন শেখার চেষ্টা করবে, শিখতে শিখতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে অর্থাৎ শেখার জন্য সে চেষ্টা করে, তার জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি)।
বিভীষিকাময় কিয়ামত দিবসে যখন আপনজন ও ধন-সম্পদ কোনো কাজে আসবে না, তখন কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। হজরত আবু উমামা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন , রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা কুরআন তেলাওয়াত কর। কারণ কিয়ামতের দিন কুরআন তার তেলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ করবে।’ (সহিহ মুসলিম) অন্যত্র রয়েছে , ‘কিয়ামতের দিন কুরআন তার তেলাওয়াতকারী ও আদেশ-নিষেধ মান্যকারীকে বলবে, আমাকে চিনতে পারছো? আমি সেই কুরআন যে তোমাকে রোযার আদেশ দিয়ে দিনে পিপাসার্ত আর রাতে নামাযে রত রেখেছি। প্রত্যেক ব্যবসায়ীই তার ব্যবসার মাধ্যমে লাভবান হতে চায়। আজ তুমি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছ। তারপর ওই বান্দার ডান হাতে বাদশাহি, বাম হাতে জান্নাতে বসবাসের পরোয়ানা দেওয়া হবে। মাথায় নূরের তাজ পরানো হবে এবং বলা হবে, কুরআন পড়তে থাকো আর উচ্চ মকামে উঠতে থাকো।’ (মুসনাদে আহমদ)
নামাযে কুরআন তেলাওয়াত:
নামাযে আমরা কুরআন তিলাওয়াত করে থাকি নামাযের ফরয বিধান হিসাবে। কুরআন তিলাওয়াতের যে আদবসমূহ উপরে আলোচিত হল সেগুলো নামাযে তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রযোজ্য। নামাযে তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে ধীরস্থিরতা ও ভাবগাম্ভীর্য আরো বেশি মাত্রায় থাকতে হবে। তখন এগুলো শুধু তিলাওয়াতের বিষয় হিসাবেই থাকে না বরং এই ধীরস্থিরতা ও আত্মনিমগ্নতা নামাযেরও বিষয়। নামাযের খুশু-খুযুর জন্য তিলাওয়াত তারতীলের সাথে হওয়া খুব জরুরি। তাছাড়া এত দ্রুত তিলাওয়াতের কারণে মদ্দ-গুন্নাসহ তাজবীদের অনেক কায়েদা লঙ্ঘিত হয় এবং হুরফের ছিফাতের প্রতিও যথাযথ লক্ষ্য রাখা যায় না, ফলে দ্রুত পড়তে গিয়ে ص এর জায়গায় س হয়ে যাওয়া, ش এর জায়গায় س হয়ে যাওয়া, ﻁ এর জায়গায় ت হয়ে যাওয়া কিংবা যেখানে টান নেই সেখানে টান হয়ে যাওয়া বা কোথাও টান আছে সেখানে টান না হওয়া (দ্রুত পড়তে গেলে এই টানের ভুল সব চেয়ে বেশি হয়) খুব সহজেই ঘটে যেতে পারে।
মোটকথা নামাযে দ্রুত তিলাওয়াত করতে গিয়ে নামায নষ্ট হয়ে যাওয়ার মত ভুল যদি নাও হয় বরং শুধু যদি এটুকু হয় যে, উচ্চারণে মাকরূহ পর্যায়ের বিঘ্ন ঘটছে তাহলে সেই নামাযও কি ত্রুটিযুক্ত হয়ে পড়ল না? আর যদি ধরে নেওয়া হয় যে, কেউ সকল উচ্চারণ ঠিক রেখে খুব দ্রুত পড়ে যেতে পারেন তার জন্যও তো নামাযে অন্তত এমনটি না করা উচিত। কারণ তাতে কুরআন তিলাওয়াতের ন্যূনতম আদবটুকুও যেমন রক্ষিত হয় না তেমনি নামাযে খুশু-খুযু রক্ষা করাও সহজ হয় না।
ফরয নামায ও অন্যান্য নামাযে আমরা কিছুটা ধীরস্থির তিলাওয়াত করে থাকি। কিন্তু রমযানে তারাবীতে এত দ্রুত পড়ে থাকি, এতই দ্রুত যে তারতীলের ন্যূনতম মাত্রাও সেখানে উপস্থিত থাকে না। মদ্দ (টান), গুন্নাহ ও শব্দের উচ্চারণ বিঘ্নিত হয়ে তিলাওয়াত মাকরূহ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে; বরং অর্থের পরিবর্তন হয়ে নামায নষ্ট হয়ে যায়, আমাদের অজান্তেই। আর খুশু-খুযু, ধ্যানমগ্নতা তো নষ্ট হচ্ছেই। আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সুমহান কালাম পড়ছি বা শুনছি এমন ভাব-তন্ময়তা তো দূরের কথা কখন বিশ রাকাত তারাবী শেষ হবে এই চিন্তাই যেন সকলকে তাড়িত করতে থাকে।
নামায বা তিলাওয়াতের যে আদবটুকু ফরয নামাযে রক্ষা হয় তারাবীতে সেটুকু পাওয়াও দুষ্কর। দ্রুত তিলাওয়াত, দ্রুত রুকু, সেজদা, দ্রুত তাসবীহ। অনেকের মাঝে ধারণা জন্মে গেছে, তারাবী মানেই তাড়াতাড়ি পড়া। যার কারণে দেখা যায় যে, যারা ‘সূরা’-তারাবী পড়েন তারাও ভীষণ দ্রুত পড়েন।
অনেকেই মুসল্লিদের কষ্টের কথা বলে থাকেন। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, ধীরস্থিরভাবে বিশ রাকাত নামায পড়ার কারণে যতটুকু কষ্ট-ক্লান্তি আমাদের হয় তার চেয়ে বেশি হয় কিয়াম, রুকু, সেজদা, তাসবীহ দ্রুত করার কারণে। দুই রাকাত শেষে সালাম ফিরিয়েই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যাওয়া। চার রাকাত পড়ে খুব সামান্য একটু সময় বসে আবার শুরু করা। অথচ সালাফে সালেহীনের আমল ছিল তার বিপরীত, যা আমরা পূর্বেই আলোকপাত করেছি। কেননা, হাদীস শরীফে কাকের ঠোকরের মত রুকু, সেজদা করা থেকে শক্তভাবে নিষেধ করা হয়েছে। মূলত তিলাওয়াত ধীরে করে কিয়াম একটু লম্বা করলে, রুকু, সেজদায় সময় নিলে এবং উঠাবসায় ধীরস্থিরতা অবলম্বন করলে কষ্ট অনেকই কমে যায়। বয়স্কদের কথা যদি বলেন তাদের জন্য তো ধীরস্থিরতাই সহজ। তাছাড়া বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য কেরাত ছোট করার কথা হাদীসে রয়েছে। তাড়াতাড়ি করার কথা তো নেই! এদের যদি খতম তারাবী একেবারেই কষ্ট হয়ে যায় তাহলে সূরা তারাবী পড়তে পারেন। আর তারাবীর নামায যেমন গুরুত্বপূর্ণ আমল তেমনই ফযীলতপূরণ। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ.
যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে, সওয়াবের আশায় রমযানে কিয়াম করে (তারাবী, তাহাজ্জুদ সবই এর অন্তর্ভুক্ত) আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস :২০০৯)
অন্যত্র রয়েছে-
خَرَجَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْم وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
...সে যাবতীয় গুনাহ থেকে নবজাত শিশুর মত পবিত্র হয়ে যাবে। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস: ২২১০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩২৮)
নামাযে অশুদ্ধ কেরাত পড়ার বিধান
নামাযের কেরাতে অর্থ বিকৃত হয়ে যায়, এমন ভুল পড়লে নামায নষ্ট হয়ে যাবে। চাই তা তিন আয়াত পরিমাণের ভেতর হোক বা পরে হোক- সর্বাবস্থায় একই হুকুম। পক্ষান্তরে সাধারণ ভুল- যার দ্বারা অর্থ একেবারে বিগড়ে যায় না, তাতে নামাজ নষ্ট হবে না। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/১১৮, ফাতাওয়া কাজি খান ১/৬৭)
কিন্তু সুরা-কেরাত ও নামাযের তাসবিহ ইত্যাদি শুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত নামায ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি নেই। সূরা-কেরাতও শুদ্ধ করতে থাকবে এবং নামাযও আদায় করতে থাকবে, তবে এ ধরনের লোকেরা শুদ্ধ পাঠকারী ব্যক্তির ইমামতি করবে না। (হিদায়া ১/৫৮, জাওয়াহিরুল ফিক্হ ১/৩৩৯)
কেরাতের গুরুত্ব ও ফযীলত:
১. হযরত আলী রা. বলেন, যে ব্যক্তি কোরআন শরীফের যে কোন একটি হরফ পড়ে বা শ্রবণ করে, সে দশটি সওয়াব পায়। তার দশটি গুনাহ মাফ হয়ে যায়। জান্নাতে তার মর্যাদা দশ ধাপ এগিয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি নামাযে বসাবস্থায় কুরআন পড়ে, প্রতিটি হরফের বদলে সে ৫০টি করে সওয়াব, ৫০টি করে গুনাহ মাফ এবং জান্নাতে ৫০ ধাপ করে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। যে ব্যক্তি নামাযের মধ্যে দাঁড়ানো অবস্থায় কুরআন পড়ে, সে প্রতি হরফের পরিবর্তে একশ একশ করে সওয়াব লাভ করে, একশটি করে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এবং জান্নাতে তার মর্যাদা একশ ধাপ করে এগিয়ে যায়।
২. যে ব্যক্তি ইমামের পিছনে দাঁড়িয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইমামের সূরা ফাতিহা শ্রবণ করে সে ঐ ব্যক্তির মত যে শুরু থেকে জিহাদে শরীক হয়ে একেবারে শত্রুর দেশ জয় করে এসেছে। তথা সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জিহাদ করার সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহার শেষের দিকে এসে শরীক হয় সে ঐ ব্যক্তির মত যে জিহাদের অংশ গ্রহণ করেনি কিন্তু বিজয়ের পর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টনের সময়ে এসে উপস্থিত হল। পার্থক্যটা নিচের ঘটনা থেকে স্পষ্ট আকারে ফুটে উঠবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা কে একটি বাহিনীর সাথে জিহাদে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। বাহিনীর সবাই জিহাদে চলে গেলেন, কিন্তু তিনি এই ভয়ে জিহাদে যাননি, যে হয়তো আমি শহীদ হয়ে যাব আর কখনো রাসূলের পিছনে জুমা পড়ার সুযোগ পাব না। অর্থাৎ শুধু রাসূলের পিছনে জুমার নামায পড়ার আশায় জিহাদে যাননি। জুমার পর যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি জানতে পারলেন, তখন জিহাদে না যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন- তিনি ধারণাটাকে দ্বিতীয়ববার ব্যক্ত করলেন এবং বললেন, আমি এখনই যাব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আব্দুল্লাহ! বাহিনীর অন্যান্য সদস্য এবং তোমার মাঝে পাঁচ শত বছরের পার্থক্য হয়ে গেল। অর্থাৎ কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তোমার এবং তাদের মাঝে এত বড় পার্থক্য সৃষ্টি হল। (মিশকাতুল মাসাবীহ )
বর্তমানে অনেক লোককে দেখা যায় তারা বাংলা উচ্চারণ দেখে কোরআন পাঠ করে থাকেন অথচ আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় কোরআন পাকের সঠিক উচ্চারণ অসম্ভব, তাই কোরআন পাককে অন্য ভাষায় লেখা বা পড়া উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে নাজায়েজ। এতে কোরআনের শব্দ ও অর্থ বিকৃত হয়ে যায়, যা সম্পূর্ণ হারাম। (আল ইতকান, পৃ. ৮৩০, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১/৪৩)
আবার অনেক লোককে দেখা যায় তারা কোরআন শুদ্ধ করার চেয়েও কোরআনের অর্থ বুঝতে বেশি আগ্রহী। অর্থ বোঝা যদিও একটি জরুরি কাজ, কিন্তু সবার আগে জরুরি হলো তেলাওয়াত শুদ্ধ করা। এটি হলো ফরজে আইন, এর ওপর নামাজ শুদ্ধ হওয়ার ভিত্তি। প্রত্যেক নর-নারীর ওপর কোরআন এতটুকু সহিহ শুদ্ধ করে পড়া ফরজে আইন, যার দ্বারা অর্থ পরিবর্তন হয় না। অর্থ পরিবর্তন হয়, এমন ভুল পড়ার দ্বারা নামাজ নষ্ট হয়ে যায়। অতএব কমপক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য যে সুরাগুলোর প্রয়োজন, সেগুলো শুদ্ধ করে নেওয়া আবশ্যক, অন্যথায় সে গুনাহগার হবে। (মুকাদ্দামায়ে জাজারিয়া, পৃ. ১১) আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করে নির্ভুল কুরআন তিলাওয়াত করার তাওফিক দান করুন, আমিন বিহুরমাতি সৈয়্যদিল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
http://www.anjumantrust.org/2021/01/09/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7-%e0%a6%89%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a 6%9a%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a3-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a6%86%e0%a6%a8-%e0%a6%a4%e0%a7%87/
কোন মন্তব্য নেই