ফরমানে রেযা: প্রচলিত কিছু গর্হিত কাজের শরয়ী বিধান
মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
[বর্তমান সমাজে এমন কিছু কাজ খুব বেশী প্রচলন হচ্ছে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন তা মামুলি বিষয়! আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি প্রণীত বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত এ ধরনের কিছু বিষয়ের কুরআন-হাদীসের আলোকে প্রামাণ্য সমাধান বর্ণিত হলো]
কুরআনুল করিম হিফয করে ভূলে যাওয়া
আ’লা হযরত আযিমুল বরকত মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত ইমাম আহমদ রযা খাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি এ প্রসঙ্গে বলেন: ঐ ব্যক্তি থেকে মুর্খ আর কে আছে? যাকে মহান আল্লাহ তাআলা এমন শক্তি (অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করার শক্তি) দান করেছেন, আর সে তা নিজেই হাতছাড়া করে দিয়েছে। যদি সে কুরআনুল করিম মুখস্থ করার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারতো এবং কুরআন মাজীদ মুখস্থ করার মাঝে কি সাওয়াব ও মর্যাদা রয়েছে তা জানতো, তবে সে কুরআন মুখস্থ করাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয় মনে করতো। তিনি আরো বলেন: যতটুকু সম্ভব কুরআন শরীফ শিক্ষা দেয়া, মুখস্থ করানো এবং নিজে মুখস্থ রাখার চেষ্টা করবে। যেন এর মাধ্যমে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারণকৃত সাওয়াব লাভ করা যায় এবং কিয়ামত দিবসে অন্ধ ও খোঁড়া হয়ে পুনরুত্থান থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ইরশাদ হচ্ছে: যে ব্যক্তি কুরআনুল করিমের কোন আয়াত মুখস্থ করার পর তা আবার ভুলে যায়, কিয়ামত দিবসে তাকে অন্ধ অবস্থায় উত্তোলন করা হবে। (নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক)
মসজিদে দুনিয়াবী কথাবার্তা
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করে বলেন: বর্ণনায় এসেছে, একটি মসজিদ আপন প্রতিপালকের নিকট অভিযোগ করতে গেলো যে, লোকেরা আমার মধ্যে দুনিয়াবী কথাবার্তা বলে থাকে। ফিরিশতারা আসার সময় তার সাথে সাক্ষাত হয় এবং বলে: আমাদেরকে তাদের (মসজিদে কথোপকথনকারী) ধ্বংস করার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: একটি যুগ এরূপ আসবে, মসজিদের মধ্যে মানুষের কথাবার্তা নিজেদের দুনিয়াবী অবস্থাদির ব্যাপারে হবে, তোমরা এরূপ ব্যক্তিদের সাহচর্যে বসো না। কেননা, এরূপ লোকেদের আল্লাহ তায়ালার কোন প্রয়োজন নেই। প্রসিদ্ধ মুফাসসীর হাকীমুল উম্মত মুফতী আহমদ ইয়ার খাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বলেন: আল্লাহ তা’আলা এ ধরনের ব্যক্তিদের প্রতি দয়া করবেন না। বস্তুত রব তা‘আলার এমন কোন বান্দারই প্রয়োজন নেই, তিনি প্রয়োজন থেকে পবিত্র।
হযরত সায়্যিদুনা সায়েব বিন ইয়াজিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন: একদা আমি মসজিদে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কেউ আমাকে পাথর কণা নিক্ষেপ করলো। আমি ফিরে দেখলাম, তিনি আমীরুল মু’মিনিন হযরত সায়্যিদুনা ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন। তিনি (উচ্চ আওয়াজে কথা বলা দু’জন ব্যক্তির দিকে ইশারা করে) আমাকে বললেন যে, যাও! এবং ঐ দু’জনকে আমার নিকট নিয়ে আসো। আমি সেই দু’জনকে নিয়ে উপস্থিত হলাম। ফারুকে আযম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন: তোমরা কোথাকার অধিবাসী? তারা আরয করলো: আমরা তায়েফের অধিবাসী। তিনি বললেন: যদি তোমরা উভয়ই মদীনার অধিবাসী হতে তবে আমি তোমাদের শাস্তি দিতাম। কেননা, তোমরা রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে উচ্চ আওয়াজে কথা বলছিলে। হাকীমুল উম্মত মুফতী আহমদ ইয়ার খাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি উপরোক্ত হাদীস শরীফের আলোকে বলেন: তারা দুনিয়াবী বিষয়ে উচ্চ আওয়াজে কথোপকথন করছিলো, নয়তো মসজিদে দরস, শিক্ষা দেয়া, আল্লাহ তায়ালার যিকির (এবং) নাত শরীফ ইত্যাদি উচ্চ আওয়াজে করতে পারবে, যদি নামাযীর কষ্ট না হয়।
মসজিদের কয়েকটি আদব
১. অনেক মসজিদে নিয়ম রয়েছে যে, রমযানুল মুবারকে লোকেরা নামাযীদের জন্য ইফতারী প্রেরণ করে। তা ই’তিকাফের নিয়্যত ছাড়া সেখানেই তা নির্বিঘেœ খাওয়া হয় এবং মেঝে ময়লা করা হয়, তা না-জায়িয। ২. ওযু করার পর ওযুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থেকে এক ফোঁটা পানির ছিটাও যেন মসজিদের মেঝেতে না পড়ে। ৩. মসজিদে যদি হাঁচি আসে তবে চেষ্টা করতে হবে, আওয়াজ যেন ধীরে বের হয়, এমনিভাবে কাঁশিও। কেননা,আল্লাহ তা‘য়ালার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে জোরে হাঁিচ দেয়াকে অপছন্দ করতেন। ৩. মসজিদে দুনিয়াবী কোন কথা না বলা। হ্যাঁ! যদি কোন দ্বীনি কথা কাউকে বলতে হয় তবে নিকটে গিয়ে নি¤œস্বরে বলা উচিৎ।
বদ মাযহাবীর সাথে সম্পর্ককরণ
ইমাম আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: অন্য মাযহাবীদের (নারী ও পুরুষ) সাহচর্য হচ্ছে আগুন তুল্য। জ্ঞানী, বিবেক সম্পন্ন, প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের মাযহাবও তাদের কারণে বিগড়ে গেছে। ইমরান বিন হাত্তান রাকাশী- এর একটি গল্প প্রসিদ্ধ রয়েছে, সে তাবেঈনের যুগে একজন বড় মুহাদ্দীস ছিলো। বদ মাযহাবের মহিলাকে বিয়ে করে তার সংস্পর্শে থেকে নিজেও বদ মাযহাবী হয়ে গিয়েছে এবং সে এই দাবী করতো যে, (তাকে বিয়ে করে) সুন্নি বানাতে চায়। যখন সংস্পর্শের এই অবস্থা (যে, এত বড় মুহাদ্দীস পথভ্রষ্ট হয়ে গেলো) তখন (বদ মাযহাবীকে) শিক্ষক বানানো কত বড় নিকৃষ্ট কাজ হবে। কেননা, শিক্ষকের প্রভাব অনেক বেশী এবং দ্রুত হয়ে থাকে, তবে অন্য মাযহাবের মহিলার (বা পুরুষের) সমর্পনে বা শিষ্যত্বে নিজের সন্তানকে সেই দেবে, যে নিজেও দ্বীনের সাথে সম্পর্ক রাখে না এবং নিজের সন্তান বদ মাযহাব হয়ে যাওয়াতে ভ্রুক্ষেপ করে না।
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই বিষয়ে বুযুর্গদের আমলকে উদ্ধৃত করে বলেন: আব্দুল্লাহ্ বিন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শিষ্য হযরত সায়্যিদুনা সা’আদ বিন জুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার সাথে পথে একজন বদ মাযহাবের লোকের সাক্ষাৎ হলো। লোকটি বললো: হুযূর! কিছু আরয করতে চাই। তিনি বললেন: আমি শুনতে চাই না। আরয করলো: একটি বাক্য। তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলী ও কনিষ্টাঙ্গুল একত্র করে বললেন: অর্ধেক শব্দও নয়। লোকেরা আরয করলো: এর কারণ কি? বললেন: সে হলো তাদেরই দলভূক্ত অর্থাৎ পথভ্রষ্ট।
(এমনিভাবে) ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সীরিন রহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট দু’জন বদ মাযহাবী লোক এসেছিলো। আরয করলো: কিছু আল্লাহ্ তা‘আলার আয়াত আপনাকে শুনাই! তিনি বললেন: আমি শুনতে চাই না। আরয করলো, কিছু হাদীসে নববী শুনাই! তিনি বললেন: আমি শুনতে চাই না। তারা জোরাজোরি করলো। বললেন: তোমরা দু’জন চলে যাও নয়তো আমি চলে যাচ্ছি। অবশেষে তারা চলে গেলো। লোকেরা আরয করলো: হে ইমাম! আপনার কি সমস্যা ছিলো, যদি তারা কিছু আয়াত বা হাদীস শুনাতো? বললেন: আমি ভয় করেছি যে, তারা আয়াত ও হাদীসের সাথে নিজেদের কিছু মতবাদী ব্যাখ্যা লাগিয়ে দেবে এবং তা আমার অন্তরে গেঁথে যাবে, তবে আমি ধ্বংস হয়ে যাবো।
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই ঘটনা উদ্ধৃত করার পর বলেন: ইমামদের তো এই ভয় এবং সাধারণের কিরূপ সাহস দেখো! নিরাপত্তার পথ তাই, -যা তোমাদেরকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তাদের (বদ মাযহাবীদের) থেকে দূরে থাকো এবং তাদেরকে নিজেদের থেকে দূরে রাখো, যেন তারা তোমাদের পথভ্রষ্ট করতে না পারে, যেন তোমাদের ফিতনায় ফেলতে না পারে। দেখো! মুক্তির পথ তাই যা তোমাদের মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন: অতঃপর স্মরণে আসতেই যালিমদের নিকট বসো না। ভুলে তাদের কারো সাথে বসে গেলে তবে স্মরণ আসতেই দ্রুত দাঁড়িয়ে যাও।
যদি পিতামাতা পরস্পর ঝগড়া করে তবে সন্তান কি করবে?
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: যদি পিতা-মাতার পরস্পরের মধ্যে মনোমালিন্য হয় তখন সন্তান মায়ের পক্ষও অবলম্বন করবে না, পিতার পক্ষও অবলম্বন করবে না। কখনো যেনো এমন না হয় যে, মায়ের ভালবাসায় পিতার উপর কঠোরতা করবে। পিতার মনে দুঃখ দেওয়া বা তাঁর সাথে তর্ক করা কিংবা বেয়াদবীর সাথে চোখ রাঙ্গিয়ে কথা বলা এসব কিছু হারাম এবং আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয়ে সন্তানের এভাবে পিতামাতার মধ্যে কারো পক্ষ অবলম্বন করা কখনো জায়িয নয়। তাঁরা উভয়েই তার জন্য জান্নাত ও জাহান্নাম। যাকেই কষ্ট দিক না কেনো জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতার ব্যাপারে কারো আনুগত্য বৈধ নয়। যেমন; মা চায় যে, সন্তান তার পিতাকে কষ্ট প্রদান করুক আর যদি সন্তান না শুনে অর্থাৎ পিতার উপর কঠোরতা প্রদর্শন করতে রাজি না হয় তবে অসন্তুষ্ট হয়ে যাবে, এমতাবস্থায় মা অসন্তুষ্ট হোক তবুও কখনো এ বিষয়ে মায়ের কথা শুনবে না, অনুরূপ, মায়ের ব্যাপারেও পিতার কথা শুনবে না। ওলামায়ে কিরাম এভাবে ভাগ করেছেন যে, খিদমতের ব্যাপারে মা প্রাধান্য পাবে এবং সম্মানের ব্যাপারে পিতা বেশী প্রাধান্য পাবে। কেননা, তিনি তার মায়েরও শাসক এবং মুনিব। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- তিন ধরনের লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না। যথা- ১.মাতা-পিতাকে কষ্টদাতা ২. দায়্যুস ৩.পুরুষের বেশ ভূষাধারণী মহিলা।
সৈয়দ হওয়ার প্রমাণ চাওয়া কেমন?
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে সৈয়দ বংশীয়দের সৈয়দ হওয়ার প্রমাণ চাওয়া এবং না পাওয়াতে গালমন্দকারী ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি উত্তরে বলেন: ফকির (অর্থাৎ নিজেকে তিনি ফকির বলে উল্লেখ করেছেন) অনেক ফতোয়া দিয়েছি যে, কাউকে সৈয়দ মনে করা এবং তাঁকে সম্মান করার জন্য আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগতভাবে তার সৈয়দ হওয়া সম্পর্কে জানা আবশ্যক নয়, যে লোকেরা সৈয়দ পরিচয় দেয়, আমরা তাঁদের সম্মান করবো, আমাদের অনুসন্ধান করার প্রয়োজন নেই, সৈয়দ হওয়ার প্রমাণ চাওয়ারও আমাদের আদেশ দেয়া হয়নি এবং জোরপূর্বক প্রমাণ দেখানোর প্রতি বাধ্য করা এবং না দেখানোতে গালমন্দ করা, বদনাম করা নাজায়িয তথা বৈধ নয়। তবে হ্যাঁ! যাদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে আমরা ভালভাবে জানি যে, তারা সৈয়দ নয় এবং তারা নিজেকে সৈয়দ দাবী করছে, তবে তাদের সৈয়দ হিসেবে সম্মান করবো না, না তাদের সৈয়দ বলবো আর উচিৎ হবে যে, অনবহিতদেরকে তাদের ধোঁকা সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া।
যাদের সৈয়দ বংশীয়দের সম্মান ও মর্যাদা এবং আদব রক্ষা বা তাঁদের চাহিদা পূরণ করার ততক্ষণ পর্যন্ত মানসিকতাই তৈরী হয়না, যতক্ষণ সৈয়দ বংশীয়রা নিজেদের বংশনামা সম্পর্কে কোন সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারে না বা সনদ দেখাতে পারে না- এরূপ লোকদের ভয় করা উচিৎ যে, তাদের এই মন্দ স্বভাবের কারণে যদি নানা-ই হাসানাইন, তাজেদারে হারামাইন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসন্তুষ্ট হয়ে যান এবং কিয়ামতের দিন তার থেকে মুসলমান হওয়ার প্রমাণ চান, তবে মনে রাখুন! তখন ভয়াবহ লজ্জায় পড়তে হবে। সৈয়দ বংশীয়দের কেনইবা ভালবাসবো না, কেননা এই ব্যক্তিদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করার জন্য তো কোরআনে করীমেও ইরশাদ হয়েছে: হে হাবিব! আপনি বলুন,‘আমি সেটার জন্য তোমাদের নিকট থেকে কোন পারিশ্রমিক চাই না, কিন্তু চাই নিকটাত্মীয়তার ভালোবাসা। বর্ণনাকৃত আয়াতে করিমার তাফসীরে আ’লা হযরত, ইমামে আহলে সুন্নাত মাওলানা শাহ ইমাম আহমদ রযা খাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: قربي দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সৈয়দ বংশীয়রা এবং আহলে বাইত। সৈয়দ বংশীয়দের সম্মান করা ফরয এবং তাঁদের অসম্মান করা হারাম বরং ওলামায়ে কিরাম বলেন: যে ব্যক্তি কোন আলিমকে মাওলাভীয়া বা কোন মীর (সৈয়দ) কে মীরুয়া তুচ্ছ করে বলবে, সে কাফির সাব্যস্ত হবে।
আ’লা হযরত এবং সৈয়দের সম্মান
হায়াতে আ’লা হযরত কিতাবে রয়েছে: জনাব সৈয়দ আইয়ুব আলী সাহেব বর্ণনা করেন: একজন অল্প বয়স্ক ছেলে ঘরের কাজ কর্মে সাহায্য করার জন্য আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহির ঘরে চাকরি নেয়। হুযূর পরে জানতে পারলেন যে, ইনি হচ্ছেন সৈয়দজাদা। অতঃপর তিনি পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করে বলে দিলেন, সাবধান! সৈয়দজাদাকে দিয়ে কোন কাজ করাবে না, কেননা ইনি হচ্ছেন প্রিয় আক্বা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধরদের অন্তর্ভূক্ত। তাঁর থেকে খেদমত গ্রহণ করবে না বরং তাঁর খেদমত করা উচিৎ। সুতরাং পানাহার এবং যা কিছুই প্রয়োজন হয় তাঁর খেদমতে পেশ করবে। যে বেতনের কথা হয়েছিলো তা উপহার স্বরূপ পেশ করতে থাকবে। এভাবে হুযূরের আদেশ অনুযায়ী আমল হতে থাকলো। কিছুদিন পর সেই সৈয়দজাদা নিজ থেকেই বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
আলিমের পরিচয়
আলিমের পরিচয় এই যে, তাঁকে আক্বীদা সম্পর্কে পরিপূর্ণ রূপে ধারণা রাখতে হবে, অটল ও স্বাধীনচেতা হতে হবে এবং নিজের প্রয়োজনের বিষয়াদি অন্য কারো সাহায্য ব্যতিরেকে নিজে নিজে কিতাবাদি থেকে বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে। কিতাবাদি অধ্যয়ন করে এবং আলিমদের নিকট শুনে শুনেও ইলম হাসিল করা যায়। বুঝা গেল, আলিম হবার জন্য দরসে নেজামীর (কিংবা আলিয়া মাদ্রাসার) সার্টিফিকেট যেমন জরুরি ও যথেষ্ট নয়, তেমনি আরবি, ফার্সী ইত্যাদি জানাও শর্ত নয়; বরং জ্ঞান থাকা জরুরী। আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন: সার্টিফিকেট কোন বিষয়ই নয়। এমন অনেকই রয়েছে, যাদের সার্টিফিকেট আছে কিন্তু বিন্দুমাত্র ইল্েম দ্বীন নেই। অথচ এমন অনেক রয়েছেন যাঁদের সার্টিফিকেট বলতেই নেই, কিন্তু অনেকে সার্টিফিকেটধারী তাঁদের ছাত্র হওয়ার যোগ্যতাও রাখে না। মোটকথা, ইলম (জ্ঞান) থাকাই জরুরী।
আলিম নন এমন কেউ বয়ান করার হুকুম
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ওয়াজ বলুন আর যে কোন ধরনের কথাবার্তাই বলুনÑ এতে সব চেয়ে প্রথম কথা হল আল্লাহ্ তাআলা ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি। যে ব্যক্তি যথেষ্ট জ্ঞানের মালিক নন, তার পক্ষে ওয়াজ করা হারাম। সেই ব্যক্তির ওয়াজ শোনাও জায়েয নেই। কেউ যদি বদ-মাযহাবী হয়ে থাকে, তাহলে সে তো শয়তানেরই প্রতিনিধি। তার কথা শোনা তো জঘন্য ধরনের হারাম। (মসজিদে বয়ান দেবার ক্ষেত্রে তাকে বাধাঁ প্রদান করতে হবে)। আবার কারো বয়ান দ্বারা যদি ফিতনা সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে তাকেও ইমাম সাহেব সহ মসজিদের উপস্থিত লোকজন বাধা দেবার হক রাখেন। আর যদি বিশুদ্ধ আকীদাসম্পন্ন পরিপূর্ণ সুন্নী আলেমে দ্বীন ওয়াজ করে থাকেন, তাহলে তাঁকে বাধা দেবার অধিকার কেউ রাখে না। যেমন: মহান আলাøহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন: কোন্ ব্যক্তি তার চেয়ে অধিক অত্যাচারী, যে আল্লাহ্র মসজিদ সমূহে তাঁর নাম নেওয়ায় বাধা প্রদান করে?
আলিম নন, এমন ব্যক্তির বয়ানের ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিতে গিয়ে আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: কেবল উর্দু জানা কোন জ্ঞানহীন লোক যদি নিজের পক্ষ থেকে কিছু না বলে বরং কোন আলিমের লেখা থেকে পড়ে শোনায় তাহলে তাতে কোন বাধা নেই। এমন ব্যক্তির পক্ষে বয়ান দেওয়ার সহজ উপায় হল, ওলামায়ে আহ্েল সুন্নাতের কিতাবাদি থেকে প্রয়োজন মত ফটোকপি করিয়ে নিয়ে সেগুলোর কাটিংগুলো নিজের ডায়েরীতে লাগিয়ে নেবেন এবং তা থেকে পড়ে পড়ে শুনাবেন। নিজ থেকে কিছুই বলবে না। নিজের মতামত থেকে পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতের কিংবা হাদিস শরীফের কোন ব্যাখ্যা প্রদান করবে না। কেননা, ‘তাফসীর বির রায়’ বা নিজের মন থেকে তাফসীর করা হারাম। নিজের অনুমান ও ধারণা করে কুরআনের আয়াত থেকে দলিল গ্রহণ করা কিংবা হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা করার শরীয়াতে অনুমতি নেই। নবী করীম রউফুর রহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও কুরআন শরীফের তাফসীর বা ব্যাখ্যা করে সে যেন নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।”
অজ্ঞাত ব্যক্তির কবর যিয়ারতের হুকুম
ইমাম আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: যে কবরের পরিচয় জানা যাবে না অর্থাৎ এটা মুসলমানের কবর নাকি বিধর্মীর? তবে এমন কবরের যিয়ারত করা, ফাতেহা দেয়া জায়েয নেয়। বস্তুত মুসলমানের কবর যিয়ারত করা সুন্নাত এবং ফাতেহা দেয়া মুস্তাহাব। আর কাফেরের কবর যিয়ারত করা হারাম এবং তার প্রতি ইসালে সাওয়াবের নিয়ত করাও কুফরী।
কবরে পানি ছিটানো
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: দাফনের পর কবরে পানি ছিটানো মাসনুন তথা সুন্নাত। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর মুবারকের উপর পানি ছিটানো হয়েছিল। হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ মাথা মুবারক থেকে পানি ছিটানো শুরু করেছেন এবং কদম মুবারকে সমাপ্ত করেছেন। তিনি আরো বলেন: কিছু লোক আপন প্রিয়জনের কবরে উদ্দেশ্যহীন প্রথাগতভাবে পানি ছিঁটিয়ে থাকে, এটা নাজায়েয। (তবে রোপনকৃত চারা বা গাছে পানি দেয়ার উদ্দেশ্যে ছিটালে জায়েয। অন্যথায়) এটা অপচয়। [ফতোয়ায়ে রযবীয়া,৯/৩৭৩]
মসজিদের জামাআতে ও মাযার যিয়ারতে মহিলাদের অংশগ্রহণ
মহিলা বৃদ্ধা হোক কিংবা যুবতী নামায আদায়ের জন্য মসজিদে গমন করাই নিষেধ। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, মহিলাদের জন্য নিজ কক্ষে নামায আদায় করা আন্দর মহলে আদায় করা থেকে উত্তম। আন্দর মহলে আদায় করা দালানে আদায় করা থেকে উত্তম। দালানে আদায় করা উঠানে আদায় করা থেকে উত্তম।
কানযুল উম্মাল,৭/২৭৬, হাদীস:৮৬৫
অত:পর বলেন: মসজিদে ও জামাআতে অংশগ্রহণ করা মহিলাদের জন্য ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, বরং নিষিদ্ধ।
মালফুযাতে আ’লা হযরত, ২/৩৫৯-৩৬০,
দুররে মুখতার, ২/২৬৭/, ফতহুল কাদীর, ১/৩৭৬] তিনি বলেন: গুনিয়া কিতাবে রয়েছে, মহিলারা মাযারে গমন করা জায়েয কি নাজায়েয- এ কথা জিজ্ঞেস করো না,বরং জিজ্ঞাসা করো ঐ মহিলার উপর আল্লাহ তা‘আলা ও কবরবাসীর পক্ষ থেকে কি পরিমাণ লানত বর্ষিত হয়, যখন সে ঘর থেকে সংকল্প করে তখন থেকে লা’নত শুরু হয়ে যায়। আর যতক্ষণ পর্যন্ত পূনঃরায় ঘরে ফিরে আসে না ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরেস্তারা লা’নত করতে থাকে।
[গুনিয়াতুল মুতাল্লিম,জানাযা পরিচ্ছেদ,পৃ:৫৯৪] হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজায়ে আকদাস ব্যতিত কোন মাযারে মহিলাদের গমন করার অনুমতি নেই। রাসূলুল্লাহর রওজায় উপস্থিত হওয়া সুন্নাত, ওয়াজিবের নিকটবর্তী এবং কুরআনুল করিমে পাপরাশি মোচনের ও মাগফিরাতের ঠিকানা হওয়ার ব্যাপারে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে
ولو أنهم إذ ظلموا أنفسهم جاءوك فاستغفروا الله واستغفر لهم الرسول لوجدوا الله توابا رحيما
অর্থাৎ “এবং যখন তারা নিজ আত্মার উপর জুলুম করে আপনার দরবারে উপস্থিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আর রাসূল তাদের জন্য শুপারিশ করবে তবে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালাকে তারা তাওবা কবুলকারী এবং অতি দয়ালু হিসাবে পাবে।” [সুরা নিসা:আয়াত-৬৪] নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: من زار قبري وجبت له شفاعتي অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আমার রওজা যিয়ারতে উপস্থিত হবে, তার জন্য আমার শুপারিশ অবধারিত। [শুয়াবুল ঈমান,৩/৪৯০, হাদীস:৪১৫৯] অন্যত্র ইরশাদ করেন: من حج ولم يزرني فقد جفا ني অর্থাৎ “যে ব্যক্তি হজ্ব করেছে আর আমার রওজা যিয়ারত করেনি, নিশ্চয় সে আমাকে কষ্ট দিলো।”
মাকাসিদুল হাসানা,পৃ:৪১৬,হাদীস:১১১
প্রথমত: এটা (রওজার যিয়ারত) ওয়াজিব আদায়, দ্বিতীয়ত: তাওবা কবুল, তৃতীয়ত: শুপারিশের মহাধন অর্জন, চতুর্থত: নবীজিকে কষ্ট দেয়া থেকে পরিত্রাণের মাধ্যম। পক্ষান্তরে অন্যান্য কবরস্থান, মাযার সমুহের ব্যাপারে এমন কোন জোর তাকিদ নেই। ফিতনা-ফ্যাসাদের সম্ভাবনাও রয়েছে। যদি প্রিয়জনের কবর হয়, তবে ধৈর্যহারা হবে। আর আউলিয়ায়ে কেরামের মাযারে পার্থক্যকরণ ব্যতিরেকে বেয়াদবী করা কিংবা অজ্ঞতাবশত সম্মানে অতিরঞ্জিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমনটা পরিলক্ষিত হয় এবং অনুমেয়। তাই বিরত থাকাটাই নিরাপদ।
আ’লা হযরত আযিমুল বরকত মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত ইমাম আহমদ রযা খাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি এ প্রসঙ্গে বলেন: ঐ ব্যক্তি থেকে মুর্খ আর কে আছে? যাকে মহান আল্লাহ তাআলা এমন শক্তি (অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করার শক্তি) দান করেছেন, আর সে তা নিজেই হাতছাড়া করে দিয়েছে। যদি সে কুরআনুল করিম মুখস্থ করার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারতো এবং কুরআন মাজীদ মুখস্থ করার মাঝে কি সাওয়াব ও মর্যাদা রয়েছে তা জানতো, তবে সে কুরআন মুখস্থ করাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয় মনে করতো। তিনি আরো বলেন: যতটুকু সম্ভব কুরআন শরীফ শিক্ষা দেয়া, মুখস্থ করানো এবং নিজে মুখস্থ রাখার চেষ্টা করবে। যেন এর মাধ্যমে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারণকৃত সাওয়াব লাভ করা যায় এবং কিয়ামত দিবসে অন্ধ ও খোঁড়া হয়ে পুনরুত্থান থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ইরশাদ হচ্ছে: যে ব্যক্তি কুরআনুল করিমের কোন আয়াত মুখস্থ করার পর তা আবার ভুলে যায়, কিয়ামত দিবসে তাকে অন্ধ অবস্থায় উত্তোলন করা হবে। (নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক)
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করে বলেন: বর্ণনায় এসেছে, একটি মসজিদ আপন প্রতিপালকের নিকট অভিযোগ করতে গেলো যে, লোকেরা আমার মধ্যে দুনিয়াবী কথাবার্তা বলে থাকে। ফিরিশতারা আসার সময় তার সাথে সাক্ষাত হয় এবং বলে: আমাদেরকে তাদের (মসজিদে কথোপকথনকারী) ধ্বংস করার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: একটি যুগ এরূপ আসবে, মসজিদের মধ্যে মানুষের কথাবার্তা নিজেদের দুনিয়াবী অবস্থাদির ব্যাপারে হবে, তোমরা এরূপ ব্যক্তিদের সাহচর্যে বসো না। কেননা, এরূপ লোকেদের আল্লাহ তায়ালার কোন প্রয়োজন নেই। প্রসিদ্ধ মুফাসসীর হাকীমুল উম্মত মুফতী আহমদ ইয়ার খাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বলেন: আল্লাহ তা’আলা এ ধরনের ব্যক্তিদের প্রতি দয়া করবেন না। বস্তুত রব তা‘আলার এমন কোন বান্দারই প্রয়োজন নেই, তিনি প্রয়োজন থেকে পবিত্র।
হযরত সায়্যিদুনা সায়েব বিন ইয়াজিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন: একদা আমি মসজিদে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কেউ আমাকে পাথর কণা নিক্ষেপ করলো। আমি ফিরে দেখলাম, তিনি আমীরুল মু’মিনিন হযরত সায়্যিদুনা ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন। তিনি (উচ্চ আওয়াজে কথা বলা দু’জন ব্যক্তির দিকে ইশারা করে) আমাকে বললেন যে, যাও! এবং ঐ দু’জনকে আমার নিকট নিয়ে আসো। আমি সেই দু’জনকে নিয়ে উপস্থিত হলাম। ফারুকে আযম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন: তোমরা কোথাকার অধিবাসী? তারা আরয করলো: আমরা তায়েফের অধিবাসী। তিনি বললেন: যদি তোমরা উভয়ই মদীনার অধিবাসী হতে তবে আমি তোমাদের শাস্তি দিতাম। কেননা, তোমরা রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে উচ্চ আওয়াজে কথা বলছিলে। হাকীমুল উম্মত মুফতী আহমদ ইয়ার খাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি উপরোক্ত হাদীস শরীফের আলোকে বলেন: তারা দুনিয়াবী বিষয়ে উচ্চ আওয়াজে কথোপকথন করছিলো, নয়তো মসজিদে দরস, শিক্ষা দেয়া, আল্লাহ তায়ালার যিকির (এবং) নাত শরীফ ইত্যাদি উচ্চ আওয়াজে করতে পারবে, যদি নামাযীর কষ্ট না হয়।
১. অনেক মসজিদে নিয়ম রয়েছে যে, রমযানুল মুবারকে লোকেরা নামাযীদের জন্য ইফতারী প্রেরণ করে। তা ই’তিকাফের নিয়্যত ছাড়া সেখানেই তা নির্বিঘেœ খাওয়া হয় এবং মেঝে ময়লা করা হয়, তা না-জায়িয। ২. ওযু করার পর ওযুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থেকে এক ফোঁটা পানির ছিটাও যেন মসজিদের মেঝেতে না পড়ে। ৩. মসজিদে যদি হাঁচি আসে তবে চেষ্টা করতে হবে, আওয়াজ যেন ধীরে বের হয়, এমনিভাবে কাঁশিও। কেননা,আল্লাহ তা‘য়ালার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে জোরে হাঁিচ দেয়াকে অপছন্দ করতেন। ৩. মসজিদে দুনিয়াবী কোন কথা না বলা। হ্যাঁ! যদি কোন দ্বীনি কথা কাউকে বলতে হয় তবে নিকটে গিয়ে নি¤œস্বরে বলা উচিৎ।
ইমাম আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: অন্য মাযহাবীদের (নারী ও পুরুষ) সাহচর্য হচ্ছে আগুন তুল্য। জ্ঞানী, বিবেক সম্পন্ন, প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের মাযহাবও তাদের কারণে বিগড়ে গেছে। ইমরান বিন হাত্তান রাকাশী- এর একটি গল্প প্রসিদ্ধ রয়েছে, সে তাবেঈনের যুগে একজন বড় মুহাদ্দীস ছিলো। বদ মাযহাবের মহিলাকে বিয়ে করে তার সংস্পর্শে থেকে নিজেও বদ মাযহাবী হয়ে গিয়েছে এবং সে এই দাবী করতো যে, (তাকে বিয়ে করে) সুন্নি বানাতে চায়। যখন সংস্পর্শের এই অবস্থা (যে, এত বড় মুহাদ্দীস পথভ্রষ্ট হয়ে গেলো) তখন (বদ মাযহাবীকে) শিক্ষক বানানো কত বড় নিকৃষ্ট কাজ হবে। কেননা, শিক্ষকের প্রভাব অনেক বেশী এবং দ্রুত হয়ে থাকে, তবে অন্য মাযহাবের মহিলার (বা পুরুষের) সমর্পনে বা শিষ্যত্বে নিজের সন্তানকে সেই দেবে, যে নিজেও দ্বীনের সাথে সম্পর্ক রাখে না এবং নিজের সন্তান বদ মাযহাব হয়ে যাওয়াতে ভ্রুক্ষেপ করে না।
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই বিষয়ে বুযুর্গদের আমলকে উদ্ধৃত করে বলেন: আব্দুল্লাহ্ বিন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শিষ্য হযরত সায়্যিদুনা সা’আদ বিন জুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার সাথে পথে একজন বদ মাযহাবের লোকের সাক্ষাৎ হলো। লোকটি বললো: হুযূর! কিছু আরয করতে চাই। তিনি বললেন: আমি শুনতে চাই না। আরয করলো: একটি বাক্য। তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলী ও কনিষ্টাঙ্গুল একত্র করে বললেন: অর্ধেক শব্দও নয়। লোকেরা আরয করলো: এর কারণ কি? বললেন: সে হলো তাদেরই দলভূক্ত অর্থাৎ পথভ্রষ্ট।
(এমনিভাবে) ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সীরিন রহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট দু’জন বদ মাযহাবী লোক এসেছিলো। আরয করলো: কিছু আল্লাহ্ তা‘আলার আয়াত আপনাকে শুনাই! তিনি বললেন: আমি শুনতে চাই না। আরয করলো, কিছু হাদীসে নববী শুনাই! তিনি বললেন: আমি শুনতে চাই না। তারা জোরাজোরি করলো। বললেন: তোমরা দু’জন চলে যাও নয়তো আমি চলে যাচ্ছি। অবশেষে তারা চলে গেলো। লোকেরা আরয করলো: হে ইমাম! আপনার কি সমস্যা ছিলো, যদি তারা কিছু আয়াত বা হাদীস শুনাতো? বললেন: আমি ভয় করেছি যে, তারা আয়াত ও হাদীসের সাথে নিজেদের কিছু মতবাদী ব্যাখ্যা লাগিয়ে দেবে এবং তা আমার অন্তরে গেঁথে যাবে, তবে আমি ধ্বংস হয়ে যাবো।
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই ঘটনা উদ্ধৃত করার পর বলেন: ইমামদের তো এই ভয় এবং সাধারণের কিরূপ সাহস দেখো! নিরাপত্তার পথ তাই, -যা তোমাদেরকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তাদের (বদ মাযহাবীদের) থেকে দূরে থাকো এবং তাদেরকে নিজেদের থেকে দূরে রাখো, যেন তারা তোমাদের পথভ্রষ্ট করতে না পারে, যেন তোমাদের ফিতনায় ফেলতে না পারে। দেখো! মুক্তির পথ তাই যা তোমাদের মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন: অতঃপর স্মরণে আসতেই যালিমদের নিকট বসো না। ভুলে তাদের কারো সাথে বসে গেলে তবে স্মরণ আসতেই দ্রুত দাঁড়িয়ে যাও।
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: যদি পিতা-মাতার পরস্পরের মধ্যে মনোমালিন্য হয় তখন সন্তান মায়ের পক্ষও অবলম্বন করবে না, পিতার পক্ষও অবলম্বন করবে না। কখনো যেনো এমন না হয় যে, মায়ের ভালবাসায় পিতার উপর কঠোরতা করবে। পিতার মনে দুঃখ দেওয়া বা তাঁর সাথে তর্ক করা কিংবা বেয়াদবীর সাথে চোখ রাঙ্গিয়ে কথা বলা এসব কিছু হারাম এবং আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয়ে সন্তানের এভাবে পিতামাতার মধ্যে কারো পক্ষ অবলম্বন করা কখনো জায়িয নয়। তাঁরা উভয়েই তার জন্য জান্নাত ও জাহান্নাম। যাকেই কষ্ট দিক না কেনো জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতার ব্যাপারে কারো আনুগত্য বৈধ নয়। যেমন; মা চায় যে, সন্তান তার পিতাকে কষ্ট প্রদান করুক আর যদি সন্তান না শুনে অর্থাৎ পিতার উপর কঠোরতা প্রদর্শন করতে রাজি না হয় তবে অসন্তুষ্ট হয়ে যাবে, এমতাবস্থায় মা অসন্তুষ্ট হোক তবুও কখনো এ বিষয়ে মায়ের কথা শুনবে না, অনুরূপ, মায়ের ব্যাপারেও পিতার কথা শুনবে না। ওলামায়ে কিরাম এভাবে ভাগ করেছেন যে, খিদমতের ব্যাপারে মা প্রাধান্য পাবে এবং সম্মানের ব্যাপারে পিতা বেশী প্রাধান্য পাবে। কেননা, তিনি তার মায়েরও শাসক এবং মুনিব। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- তিন ধরনের লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না। যথা- ১.মাতা-পিতাকে কষ্টদাতা ২. দায়্যুস ৩.পুরুষের বেশ ভূষাধারণী মহিলা।
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে সৈয়দ বংশীয়দের সৈয়দ হওয়ার প্রমাণ চাওয়া এবং না পাওয়াতে গালমন্দকারী ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি উত্তরে বলেন: ফকির (অর্থাৎ নিজেকে তিনি ফকির বলে উল্লেখ করেছেন) অনেক ফতোয়া দিয়েছি যে, কাউকে সৈয়দ মনে করা এবং তাঁকে সম্মান করার জন্য আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগতভাবে তার সৈয়দ হওয়া সম্পর্কে জানা আবশ্যক নয়, যে লোকেরা সৈয়দ পরিচয় দেয়, আমরা তাঁদের সম্মান করবো, আমাদের অনুসন্ধান করার প্রয়োজন নেই, সৈয়দ হওয়ার প্রমাণ চাওয়ারও আমাদের আদেশ দেয়া হয়নি এবং জোরপূর্বক প্রমাণ দেখানোর প্রতি বাধ্য করা এবং না দেখানোতে গালমন্দ করা, বদনাম করা নাজায়িয তথা বৈধ নয়। তবে হ্যাঁ! যাদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে আমরা ভালভাবে জানি যে, তারা সৈয়দ নয় এবং তারা নিজেকে সৈয়দ দাবী করছে, তবে তাদের সৈয়দ হিসেবে সম্মান করবো না, না তাদের সৈয়দ বলবো আর উচিৎ হবে যে, অনবহিতদেরকে তাদের ধোঁকা সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া।
যাদের সৈয়দ বংশীয়দের সম্মান ও মর্যাদা এবং আদব রক্ষা বা তাঁদের চাহিদা পূরণ করার ততক্ষণ পর্যন্ত মানসিকতাই তৈরী হয়না, যতক্ষণ সৈয়দ বংশীয়রা নিজেদের বংশনামা সম্পর্কে কোন সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারে না বা সনদ দেখাতে পারে না- এরূপ লোকদের ভয় করা উচিৎ যে, তাদের এই মন্দ স্বভাবের কারণে যদি নানা-ই হাসানাইন, তাজেদারে হারামাইন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসন্তুষ্ট হয়ে যান এবং কিয়ামতের দিন তার থেকে মুসলমান হওয়ার প্রমাণ চান, তবে মনে রাখুন! তখন ভয়াবহ লজ্জায় পড়তে হবে। সৈয়দ বংশীয়দের কেনইবা ভালবাসবো না, কেননা এই ব্যক্তিদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করার জন্য তো কোরআনে করীমেও ইরশাদ হয়েছে: হে হাবিব! আপনি বলুন,‘আমি সেটার জন্য তোমাদের নিকট থেকে কোন পারিশ্রমিক চাই না, কিন্তু চাই নিকটাত্মীয়তার ভালোবাসা। বর্ণনাকৃত আয়াতে করিমার তাফসীরে আ’লা হযরত, ইমামে আহলে সুন্নাত মাওলানা শাহ ইমাম আহমদ রযা খাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: قربي দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সৈয়দ বংশীয়রা এবং আহলে বাইত। সৈয়দ বংশীয়দের সম্মান করা ফরয এবং তাঁদের অসম্মান করা হারাম বরং ওলামায়ে কিরাম বলেন: যে ব্যক্তি কোন আলিমকে মাওলাভীয়া বা কোন মীর (সৈয়দ) কে মীরুয়া তুচ্ছ করে বলবে, সে কাফির সাব্যস্ত হবে।
হায়াতে আ’লা হযরত কিতাবে রয়েছে: জনাব সৈয়দ আইয়ুব আলী সাহেব বর্ণনা করেন: একজন অল্প বয়স্ক ছেলে ঘরের কাজ কর্মে সাহায্য করার জন্য আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহির ঘরে চাকরি নেয়। হুযূর পরে জানতে পারলেন যে, ইনি হচ্ছেন সৈয়দজাদা। অতঃপর তিনি পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করে বলে দিলেন, সাবধান! সৈয়দজাদাকে দিয়ে কোন কাজ করাবে না, কেননা ইনি হচ্ছেন প্রিয় আক্বা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধরদের অন্তর্ভূক্ত। তাঁর থেকে খেদমত গ্রহণ করবে না বরং তাঁর খেদমত করা উচিৎ। সুতরাং পানাহার এবং যা কিছুই প্রয়োজন হয় তাঁর খেদমতে পেশ করবে। যে বেতনের কথা হয়েছিলো তা উপহার স্বরূপ পেশ করতে থাকবে। এভাবে হুযূরের আদেশ অনুযায়ী আমল হতে থাকলো। কিছুদিন পর সেই সৈয়দজাদা নিজ থেকেই বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
আলিমের পরিচয় এই যে, তাঁকে আক্বীদা সম্পর্কে পরিপূর্ণ রূপে ধারণা রাখতে হবে, অটল ও স্বাধীনচেতা হতে হবে এবং নিজের প্রয়োজনের বিষয়াদি অন্য কারো সাহায্য ব্যতিরেকে নিজে নিজে কিতাবাদি থেকে বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে। কিতাবাদি অধ্যয়ন করে এবং আলিমদের নিকট শুনে শুনেও ইলম হাসিল করা যায়। বুঝা গেল, আলিম হবার জন্য দরসে নেজামীর (কিংবা আলিয়া মাদ্রাসার) সার্টিফিকেট যেমন জরুরি ও যথেষ্ট নয়, তেমনি আরবি, ফার্সী ইত্যাদি জানাও শর্ত নয়; বরং জ্ঞান থাকা জরুরী। আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন: সার্টিফিকেট কোন বিষয়ই নয়। এমন অনেকই রয়েছে, যাদের সার্টিফিকেট আছে কিন্তু বিন্দুমাত্র ইল্েম দ্বীন নেই। অথচ এমন অনেক রয়েছেন যাঁদের সার্টিফিকেট বলতেই নেই, কিন্তু অনেকে সার্টিফিকেটধারী তাঁদের ছাত্র হওয়ার যোগ্যতাও রাখে না। মোটকথা, ইলম (জ্ঞান) থাকাই জরুরী।
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ওয়াজ বলুন আর যে কোন ধরনের কথাবার্তাই বলুনÑ এতে সব চেয়ে প্রথম কথা হল আল্লাহ্ তাআলা ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি। যে ব্যক্তি যথেষ্ট জ্ঞানের মালিক নন, তার পক্ষে ওয়াজ করা হারাম। সেই ব্যক্তির ওয়াজ শোনাও জায়েয নেই। কেউ যদি বদ-মাযহাবী হয়ে থাকে, তাহলে সে তো শয়তানেরই প্রতিনিধি। তার কথা শোনা তো জঘন্য ধরনের হারাম। (মসজিদে বয়ান দেবার ক্ষেত্রে তাকে বাধাঁ প্রদান করতে হবে)। আবার কারো বয়ান দ্বারা যদি ফিতনা সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে তাকেও ইমাম সাহেব সহ মসজিদের উপস্থিত লোকজন বাধা দেবার হক রাখেন। আর যদি বিশুদ্ধ আকীদাসম্পন্ন পরিপূর্ণ সুন্নী আলেমে দ্বীন ওয়াজ করে থাকেন, তাহলে তাঁকে বাধা দেবার অধিকার কেউ রাখে না। যেমন: মহান আলাøহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন: কোন্ ব্যক্তি তার চেয়ে অধিক অত্যাচারী, যে আল্লাহ্র মসজিদ সমূহে তাঁর নাম নেওয়ায় বাধা প্রদান করে?
আলিম নন, এমন ব্যক্তির বয়ানের ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিতে গিয়ে আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: কেবল উর্দু জানা কোন জ্ঞানহীন লোক যদি নিজের পক্ষ থেকে কিছু না বলে বরং কোন আলিমের লেখা থেকে পড়ে শোনায় তাহলে তাতে কোন বাধা নেই। এমন ব্যক্তির পক্ষে বয়ান দেওয়ার সহজ উপায় হল, ওলামায়ে আহ্েল সুন্নাতের কিতাবাদি থেকে প্রয়োজন মত ফটোকপি করিয়ে নিয়ে সেগুলোর কাটিংগুলো নিজের ডায়েরীতে লাগিয়ে নেবেন এবং তা থেকে পড়ে পড়ে শুনাবেন। নিজ থেকে কিছুই বলবে না। নিজের মতামত থেকে পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতের কিংবা হাদিস শরীফের কোন ব্যাখ্যা প্রদান করবে না। কেননা, ‘তাফসীর বির রায়’ বা নিজের মন থেকে তাফসীর করা হারাম। নিজের অনুমান ও ধারণা করে কুরআনের আয়াত থেকে দলিল গ্রহণ করা কিংবা হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা করার শরীয়াতে অনুমতি নেই। নবী করীম রউফুর রহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও কুরআন শরীফের তাফসীর বা ব্যাখ্যা করে সে যেন নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।”
ইমাম আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: যে কবরের পরিচয় জানা যাবে না অর্থাৎ এটা মুসলমানের কবর নাকি বিধর্মীর? তবে এমন কবরের যিয়ারত করা, ফাতেহা দেয়া জায়েয নেয়। বস্তুত মুসলমানের কবর যিয়ারত করা সুন্নাত এবং ফাতেহা দেয়া মুস্তাহাব। আর কাফেরের কবর যিয়ারত করা হারাম এবং তার প্রতি ইসালে সাওয়াবের নিয়ত করাও কুফরী।
আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: দাফনের পর কবরে পানি ছিটানো মাসনুন তথা সুন্নাত। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর মুবারকের উপর পানি ছিটানো হয়েছিল। হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ মাথা মুবারক থেকে পানি ছিটানো শুরু করেছেন এবং কদম মুবারকে সমাপ্ত করেছেন। তিনি আরো বলেন: কিছু লোক আপন প্রিয়জনের কবরে উদ্দেশ্যহীন প্রথাগতভাবে পানি ছিঁটিয়ে থাকে, এটা নাজায়েয। (তবে রোপনকৃত চারা বা গাছে পানি দেয়ার উদ্দেশ্যে ছিটালে জায়েয। অন্যথায়) এটা অপচয়। [ফতোয়ায়ে রযবীয়া,৯/৩৭৩]
মহিলা বৃদ্ধা হোক কিংবা যুবতী নামায আদায়ের জন্য মসজিদে গমন করাই নিষেধ। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, মহিলাদের জন্য নিজ কক্ষে নামায আদায় করা আন্দর মহলে আদায় করা থেকে উত্তম। আন্দর মহলে আদায় করা দালানে আদায় করা থেকে উত্তম। দালানে আদায় করা উঠানে আদায় করা থেকে উত্তম।
কানযুল উম্মাল,৭/২৭৬, হাদীস:৮৬৫
অত:পর বলেন: মসজিদে ও জামাআতে অংশগ্রহণ করা মহিলাদের জন্য ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, বরং নিষিদ্ধ।
মালফুযাতে আ’লা হযরত, ২/৩৫৯-৩৬০,
দুররে মুখতার, ২/২৬৭/, ফতহুল কাদীর, ১/৩৭৬] তিনি বলেন: গুনিয়া কিতাবে রয়েছে, মহিলারা মাযারে গমন করা জায়েয কি নাজায়েয- এ কথা জিজ্ঞেস করো না,বরং জিজ্ঞাসা করো ঐ মহিলার উপর আল্লাহ তা‘আলা ও কবরবাসীর পক্ষ থেকে কি পরিমাণ লানত বর্ষিত হয়, যখন সে ঘর থেকে সংকল্প করে তখন থেকে লা’নত শুরু হয়ে যায়। আর যতক্ষণ পর্যন্ত পূনঃরায় ঘরে ফিরে আসে না ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরেস্তারা লা’নত করতে থাকে।
[গুনিয়াতুল মুতাল্লিম,জানাযা পরিচ্ছেদ,পৃ:৫৯৪] হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজায়ে আকদাস ব্যতিত কোন মাযারে মহিলাদের গমন করার অনুমতি নেই। রাসূলুল্লাহর রওজায় উপস্থিত হওয়া সুন্নাত, ওয়াজিবের নিকটবর্তী এবং কুরআনুল করিমে পাপরাশি মোচনের ও মাগফিরাতের ঠিকানা হওয়ার ব্যাপারে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে
ولو أنهم إذ ظلموا أنفسهم جاءوك فاستغفروا الله واستغفر لهم الرسول لوجدوا الله توابا رحيما
অর্থাৎ “এবং যখন তারা নিজ আত্মার উপর জুলুম করে আপনার দরবারে উপস্থিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আর রাসূল তাদের জন্য শুপারিশ করবে তবে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালাকে তারা তাওবা কবুলকারী এবং অতি দয়ালু হিসাবে পাবে।” [সুরা নিসা:আয়াত-৬৪] নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: من زار قبري وجبت له شفاعتي অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আমার রওজা যিয়ারতে উপস্থিত হবে, তার জন্য আমার শুপারিশ অবধারিত। [শুয়াবুল ঈমান,৩/৪৯০, হাদীস:৪১৫৯] অন্যত্র ইরশাদ করেন: من حج ولم يزرني فقد جفا ني অর্থাৎ “যে ব্যক্তি হজ্ব করেছে আর আমার রওজা যিয়ারত করেনি, নিশ্চয় সে আমাকে কষ্ট দিলো।”
মাকাসিদুল হাসানা,পৃ:৪১৬,হাদীস:১১১
প্রথমত: এটা (রওজার যিয়ারত) ওয়াজিব আদায়, দ্বিতীয়ত: তাওবা কবুল, তৃতীয়ত: শুপারিশের মহাধন অর্জন, চতুর্থত: নবীজিকে কষ্ট দেয়া থেকে পরিত্রাণের মাধ্যম। পক্ষান্তরে অন্যান্য কবরস্থান, মাযার সমুহের ব্যাপারে এমন কোন জোর তাকিদ নেই। ফিতনা-ফ্যাসাদের সম্ভাবনাও রয়েছে। যদি প্রিয়জনের কবর হয়, তবে ধৈর্যহারা হবে। আর আউলিয়ায়ে কেরামের মাযারে পার্থক্যকরণ ব্যতিরেকে বেয়াদবী করা কিংবা অজ্ঞতাবশত সম্মানে অতিরঞ্জিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমনটা পরিলক্ষিত হয় এবং অনুমেয়। তাই বিরত থাকাটাই নিরাপদ।
কোন মন্তব্য নেই