ঈদুল আযহা ও বর্তমান মুসলিম উম্মাহ
মূল: আল্লামা মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ নঈম উদ্দিন মুরাদাবাদী
ভাষান্তর: মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
পৃথিবীর প্রতিটি জাতির জন্য উৎসব, আনন্দ ও সুখের দিন ও সময় নির্ধারিত থাকে। কোন এক রাজ্যে জনৈক রাজার পার্থিব সাফল্য তাঁর বিজয় বা দীর্ঘকাল রাজত্ব করার আনন্দে উদযাপিত হতো। একের পর এক বিজয়ের পর, পরিশ্রমী, আন্তরিক এবং নিঃস্বার্থ মানুষদের মাঝে রাজবস্ত্র ও পুরস্কার বিতরণের জন্য এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। তাঁদের পরে যাঁরা এসেছে, তাঁরা আজও সেই ঐতিহ্য ধারাবাহিক বজায় রেখেছেন। যদিও সেই রাজা ও সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছে এবং সেই সার্বভৌম ক্ষমতা দাসত্বের কলঙ্কে প্রতিস্থাপিত হয়েছে, তবুও আজও কোটি কোটি মানুষ সারা বছর ধরে ঐ দিনটির জন্য অপেক্ষা করে; বিজয় ও সাফল্যের সংগীত পরিবেশনের জন্য এবং হাজারো বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া এক তুচ্ছ ঘটনাকে অভিনয় করে উপস্থাপন করতে এখনো পর্যন্ত হাজারো মানুষ বছর জুড়ে ঐ দিনের অপেক্ষায় থাকে। আর তারা একে তাদের ধর্মীয় উৎসব বলে থাকে। এই উৎসবগুলিতে ক্রীড়া ও অভিনয়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে খেলাধুলা আর বিলাসিতার এক জমজমাট বাজার বসে। ঐ উৎসবগুলির নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি না। ভারত উপমহাদেশের মানুষ এই উৎসব সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত রয়েছে।
আরেক প্রকারের উৎসব, যা ঋতুপূজা ও ঋতু আরাধনার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। একটি ঋতুকে স্বাগত জানাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের পোশাক, চেহারা, কার্যকলাপ এবং আচার— আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। কোন কোন জায়গায় লক্ষাধিক গ্যালন তেল ঢেলে প্রদীপ জ্বালানো হয়, জুয়া, মদ্যপান প্রভৃতি অপকর্ম চলে। আর কিছু জায়গায় লক্ষাধিক গ্যালন আগুন জ্বালিয়ে এবং ঢাকঢোল পিটিয়ে আসন্ন ঋতুকে স্বাগত জানানো হয়। মানুষের পোশাক ও মুখমণ্ডলে রঙ ছিটিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, সঙ্গবদ্ধ নারী—পুরুষের ঢল নামে এবং মহা আনন্দ উদযাপনের জন্য দেশের নির্দিষ্ট কিছু স্থান কিংবা পর্যটন এলাকা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এককথায় এরূপ খুশি উদযাপন ও শোভাযাত্রা, দিবারাত্রি বিলাসিতা, আমোদ—প্রমোদ ও উল্লাসে মত্ত থাকাকে উৎসব বলে আখ্যা দেয়া হয়। যেই সময়গুলোতে মানুষ কামবাসনা ও উন্মোধনার গভীর সাগরে নিমগ্ন হয়। হাজারো বৎসর পূর্ববর্তী জনৈক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ঘটনা থেকে এর সূত্রপাত ঘটে; অথচ এর কোনো চিহ্ন কিংবা প্রভাব অবশিষ্ট নেই। ঐ জাতির উত্থান—পতন কেবলমাত্র একটি গল্পে পরিণত হয়েছে। তারা নিজেদের আনন্দ ও সুখের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে, যার ফলস্বরূপ তাদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও আন্তরিক ইচ্ছা থেকে জন্ম নেয়া এই আনন্দ আর ব্যক্তিগত আনন্দ থাকে নি। বরং তা অন্যের আবেগের উপর ভিত্তি করে তৈরি একটি সুর ও তাল, ঠিক যেমন স্বাধীন মানুষের বিয়েতে বাদকেরা ঢোল বাজায় এবং সঙ্গীত পরিবেশন করে অন্যদের উৎসাহ দেয়। এই সঙ্গীত পরিবেশন এবং বাজানোর উদ্দেশ্য হলো অন্যের আবেগকে উৎসাহিত করা। আর এর দ্বারা বাদকরা কেবল তাদের পারিশ্রমিকই নিজের জন্য গ্রহণ করে, কোন আনন্দ উপলব্ধি করে না। এই উৎসবগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু পার্থক্য হলো, উৎসবগুলো তাদের কৃত্রিম, উত্তেজক সঙ্গীতের মাধ্যমে জীবিত ও উপস্থিত মানুষের প্রকৃত আবেগ এবং অকৃত্রিম আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। আর অন্যদিকে তারা মৃত এবং কালের আবর্তে পদদলিত এক জাতির পুরোনো, গতানুগতিক সঙ্গীত পরিবেশন করে—যাদের নিজেদেরও কোনো আবেগ নেই, এমনকি আবেগপ্রবণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গীও নয়, তারা কেবল এক বিলুপ্ত জাতির মৃত অনুভূতির সঙ্গীতই পরিবেশন করে। দ্বিতীয়ত, তাদের আকাঙ্ক্ষা, উৎসবের সমস্ত কার্যকলাপ ও গতিবিধি বিলাসিতা, বাড়াবাড়ি, আনন্দ এবং কামনার পরিধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং যে আবেগের ওপর ভিত্তি করে এগুলো গড়ে উঠেছে, সেগুলোও শারীরিক বিনোদন ও কামনা—বাসনার গণ্ডিতেই আবদ্ধ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও আধ্যাত্মিকতার লেশমাত্র নেই এবং এই সমস্ত উৎসব মানুষের নিজস্ব আবেগের প্রশিক্ষণ ও সংশোধন শূন্য।
ভারতে বলিদানের প্রাচীন রীতি: কোথাও কোথাও এখনও, এবং প্রাচীনকালেও, এই উৎসবগুলোতে বিভিন্ন পশুও বলিদান করা হতো। ভারতীয় জাতিগুলোর ইতিহাস ও ধমগ্রন্থে এর সপক্ষে দলিল ও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যুক্তিসঙ্গতভাবে তা অস্বীকার করা অসম্ভব। এমনকি (তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ) বেদে ভারতের প্রাচীন অধিবাসীদের বলিদান না করার দরুন তিরস্কার করা হয়েছে। ঐতিহাসিকগণ এটাও ধারণা করেন যে, ভারতে বলিদানের কারণেই রূপ ও বিশ্লেষণ প্রভৃতির শাস্ত্রগত জ্ঞানের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। (দেখুন ‘ভারতের জনগণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’) কিন্তু এই বলিদানও উৎসবের সমমর্যাদার অধিকারী। অর্থাৎ, দেবতা বলে পরিচিত বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মানে বলিদান করত, যা তাদের পূর্বসূরিদের প্রতি সম্মান ও আনুগত্যরই প্রতীক। তাদের এই বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, দেশীয় উৎসব ও সময়গুলো ভোগ—বিলাসিতা ও কামনা—বাসনায় অতিবাহিত হয়। যা প্রয়াত মানুষের মৃত আবেগের কাহিনী পুর্নাবৃত্তি কিংবা ঋতুপূজার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই উৎসবগুলো ব্যক্তিগত আবেগের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি । এসব উৎসব আধ্যাত্মিকতার ফয়েজ শূন্য।
আমি (লেখক) আপনাদেরকে ইসলামী উৎসবগুলোর উপর সংক্ষেপে দৃষ্টিপাত করার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। বিবেচনা করে দেখতে হবে যে, বিশ্বের উৎসবগুলোর সাথে ইসলামী উৎসবগুলোর কোনো প্রাসঙ্গিকতা আছে কি না। তা ঈদুল ফিতর হোক কিংবা, ঈদুল আজহা হোক অথবা শবে বরাত; ইসলামী শরীয়ত প্রত্যেক মুসলমানের জন্য একে আনন্দময় করেছে। এই উৎসবগুলোতে মুসলমানের অবস্থা কোনো বিয়ের অতিথির মতো নয় যে, কামনার বশবর্তী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বরং সে পুরো এক মাস রোযা রেখে নিজের আত্মাকে সংস্কার করে, আনুগত্য ও ইবাদতে লিপ্ত হয় এবং শারীরিকতার উপর আধ্যাত্মিকতাকে প্রাধান্য দেয়। আর আধ্যাত্মিক শক্তি দিয়ে ইন্দ্রিয়গত ও ইন্দ্রিয়ঘটিত আবেগগুলোকে দমন ও পদদলিত করে। অতঃপর এই আধ্যাত্মিক সাফল্যের পর তার জন্য আসে এক আধ্যাত্মিক আনন্দের সময়, যাকে বলা হয় ঈদ (ঈদুল ফিতর)। এই ঈদে তারা ইন্দ্রিয়ঘটিত আনন্দের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে না, বরং তাদের আধ্যাত্মিক সাফল্যের জন্য তাদের প্রতিপালক, মাহবুবে হাকিকী, সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করে এবং একনিষ্ঠ নিয়তে তাঁর দরবারে নিজেকে সমর্পণ করে। এত দীর্ঘ রিয়াজতের পর আত্মা যদি তার পবিত্রতা ও রিয়াজত নিয়ে কোনো বিস্ময় বা গর্ব অনুভব করে, তবে তা তাকে কৃতজ্ঞতা থেকে বিচ্যুত করে। অর্থাৎ, আমি পুরো এক মাস রোযা রেখেছি, সারারাত জেগে থেকেছি, ভোগ—বিলাসিতা ত্যাগ করেছি, পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেছি এবং আমার আত্মাকে তার কামনা—বাসনা থেকে সংযত করেছি; এ সংগ্রাম আমার সাহস ও শক্তির ফল নয়। হে দয়ালু স্রষ্টা! এই সবকিছু আপনার অনুগ্রহ ও করুণাতেই সম্ভব হয়েছে, এবং আনুগত্য ও সেবার লক্ষ্যে এই সাফল্যের জন্য আমি আপনার সামনে নতজানু হয়ে কৃতজ্ঞ। এই দিনটি আধ্যাত্মিক উন্নতি, হৃদয়ের পবিত্রতা, আত্মার জ্ঞানলাভ এবং ব্যক্তির প্রকৃত সৌভাগ্যের দিন। না এটি কামনা—বাসনার সাগরে আত্মার নিমজ্জন, না কোনো নির্দিষ্ট সময়ের উপাসনা, না কোনো মৃত ব্যক্তির পার্থিব সাফল্যে অসভ্য অভিনন্দন। বস্তুত ইসলামের সকল উৎসব হলো সচেতন মুমিন ব্যক্তির আধ্যাত্মিক অর্জনের আনন্দের নাম, যা তারা তাদের প্রভু ও সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে অর্জন করে। আর তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ হলো ধূলিতে শায়িত সেই মস্তক, যা তার রূপ ও বাচনভঙ্গিতে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার একত্ব ও মহত্ত্বের তাসবীহ (খুতবা) পাঠ করে।
দ্বিতীয় ঈদ হলো আল্লাহ তাআলার প্রেমিকদের কঠোর সংযম, হজ্ব; যেখানে তাঁরা তাঁদের প্রিয় মাতৃভূমি, প্রিয় বন্ধু, প্রিয় আত্মীয়—স্বজন, সমস্ত পরিবার—পরিজন এবং প্রিয় বাসস্থান ছেড়ে আল্লাহর পথে এক দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রা শুরু করে। আত্মার কাছে প্রিয় এবং মানবিক আকাঙ্ক্ষার সাথে সম্পর্কিত সমস্ত জিনিস আল্লাহর ভক্ত মহানুভবতার সাথে বর্জন করেন এবং প্রকৃত প্রিয়তমের সন্তুষ্টি লাভের জন্য উঠে দাঁড়ান। হারামাইনের মুসাফির রাজা হলেও, রাজকীয় ক্ষমতা ও গৌরবের সাথে তার কার্যাদি করেন না, বরং একজন দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষের বেশে তা করেন, নিজের নশ্বর দেহকে দাসত্ব ও পরাধীনতার নকশায় আবদ্ধ করেন। তার গায়ে একটি কাফন জড়ানো থাকে। হাজী ধনী বা দরিদ্র, রাজা বা ভিক্ষুক যাই হোক না কেন, সকলেই ইহরামে সজ্জিত থাকেন এবং আল্লাহর স্মরণে নিমজ্জিত হয়ে শারীরিক সাজসজ্জার কোনো সম্পর্ক রাখে না। প্রতিটি পদক্ষেপে আত্মার আকাঙ্ক্ষাগুলো বিসর্জন দেয়। এভাবেই হাজীগণ হেরমে কাবায় পৌঁছেন। সাঈ ও তাওয়াফের কার্যাবলীর মাধ্যমে নফসের অন্ধত্ব দূর করে এবং প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে অতিবাহিত করে। সে তার জীবন, সম্পদ ও আরাম আল্লাহর পথে ব্যয় করে। এটি এমন এক জনসমাবেশ, যেখানে বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও স্তরের ভিন্ন ভিন্ন অভ্যাস, ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গি, ভিন্ন ভিন্ন পোশাক, ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন ভিন্ন উপভাষার মানুষ একই ভঙ্গিতে, একই মর্যাদায় এবং একই পোশাকে উপস্থিত হয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহর মহত্ত্ব ও মহিমার খুতবা শোনে। যদিও ইতিপূর্বে বুযর্গগণ আল্লাহর এই ঘরের তাওয়াফ, সাফা ও মারওয়ার সাঈ ও হজ্ব সম্পন্ন করেছিলে, কিন্তু এটি কেবল তাদের অনুভূতি ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ছিলনা। তারা নিজেদের উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে কামনা—বাসনা সংশোধন করে নফসকে আল্লাহর পথে বিনয়ী করেছেন। তাই তারা কোনো রুচিহীন গায়ক কিংবা অন্যের কামনা—বাসনার অনুকরণকারী নয়। বস্তুত আল্লাহর বান্দাদের কঠোর রিয়াজত এবং তাঁদের আন্তরিকতা ও আনুগত্যের অনুকরণই আধ্যাত্মিক আত্ম—উপলব্ধির সর্বোত্তম উপায়। নিজেই মোরাক্বাবা—মোশাহিদার কঠিন ধাপগুলো নির্ধারণ করেছে এবং তাদের আত্মা আল্লাহর অনুভূতির নিছক বাহক ও ব্যাখ্যাকারী নয়। বরং জীবন, সম্পদ ও আত্মার কামনা—বাসনা ত্যাগের মাধ্যমে এই পর্যায়গুলো সম্পন্ন করার পর পবিত্রতা এবং মহান প্রতিপালক নৈকট্য লাভ করে; এটি মানব সফলতার এক উচ্চ স্তর, যা অর্জন করা সম্পূর্ণরূপে আধ্যাত্মিক আনন্দ ও সুখের বিষয়। তাই হজ্বের বিধানাবলী পালনের পর তাদের জন্য আনন্দ ও সুখের একটি দিন আসে, যাকে ঈদুল আযহা বলা হয়। এই দিনেও তারা জাগতিক ও ইন্দ্রিয়সুখের দিকে মনোযোগ দেন না, বরং আধ্যাত্মিক নেয়ামতরাজির কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মাটিতে মাথা নত করে আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করেন। এই ঈদটা দ্বিগুণ ইবাদতের মাধ্যমে উদযাপন করে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর মহত্ত্ব ও মহিমা সম্পর্কে খুতবা প্রদান করে; যেহেতু আধ্যাত্মিক ও শারীরিক ইবাদত করতে সক্ষম হয়েছেন এবং নিজের ধন—সম্পদ ও আরাম—আয়েশ ত্যাগ করতে সফল হয়েছেন, তাই তারা সেই সম্পদ একমাত্র আল্লাহর জন্যই উৎসর্গ করেন, যা আত্মত্যাগ ও আত্মদানের বহিঃপ্রকাশ।
কুরবানী এবং মুসলমানদের অনুশীলন পদ্ধতি: উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ঈদ এবং সকল ইসলামী উৎসবকে আল্লাহর ইবাদত, সংযম ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এই সময়গুলোতে মুসলমানদের অন্তর অন্যান্য চিন্তা ধারা থেকে মুক্ত হয়ে আপন সর্বশক্তিমান প্রতিপালকের স্মরণে মগ্ন থাকে। মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি তাদেরকে অন্য কোথাও দৃষ্টিপাত করতে দেয় না। অন্যান্য জাতির মতো মুসলিম উৎসবগুলো বিলাসিতা ও আড়ম্বরের প্রদর্শনী নয়, যেখানে অন্যদের দিকে তাকাতে বা যুদ্ধ করতে হয়। বস্তুত বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা সাধারণত তাদের উৎসবের সময় সর্বদা ইবাদতে মগ্ন থাকেন। তারা জানে কীভাবে যেকোনো ঝগড়া, মারামারি ও তর্ক এড়িয়ে ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং কখনো ইসলামের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়াকে ইসলাম সমর্থন করে না।
কুরবানী: একজন মুসলিম আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কুরবানী করে। এতে ইখলাস ও মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টিই তার উদ্দেশ্য। কাউকে আঘাত করার চিন্তাটুকুও সে স্বীয় ইখলাসের পরিপন্থী মনে করে প্রত্যাখ্যান করে এবং ফিতনা ও বিশৃঙ্খলাকে আরও নিকৃষ্ট বলে মনে করে—যা সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ এবং একজন মুসলিম যাকে সর্বদা খারাপ মনে করে।
হায়! ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠরা, যারা মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ, তারা মুসলমানদেরকে তাদের রবের আনুগত্য ও ইবাদতের কর্তব্যে অত্যন্ত ব্যস্ত দেখে এটিকে তাদের উপর আক্রমণ করার ও শারীরিক ও আর্থিকসহ সর্বপ্রকার ক্ষতিসাধনের একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে। মুসলমানরা শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে যতই যত্নশীল হোক না কেন, এই পাষাণ হৃদয়ের নিষ্ঠুর লোকেরা তাদের শান্তিকামী মনোভাবকে দূর্বলতা মনে করে অন্যায়ের সুযোগ নেয় এবং অত্যাচার ও স্বৈরাচারের স্ট্রীম রুলার চালায়। বস্তুত তাদের সংগঠিত দলগুলো যুদ্ধের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত, সুযোগের অপেক্ষায়। তারা আচমকা অসহায় ব্যক্তির মতো মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটি দল কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে নির্যাতিত মুসলমানদেরকে অত্যাচারী ও উপদ্রবকারী বলে আখ্যা দেয় এবং তাদের উপর নিজেদের দখল আরও কঠোর করার জন্য আইনি ফন্দি আঁটে। এর ফলস্বরূপ, কেবল মুসলমানদেরই মারধর করা হয়, কেবল মুসলমানদেরই হত্যা করা হয়, কেবল মুসলমানদেরই অপহরণ করা হয়, কেবল মুসলমানদেরই তাদের বাড়ি ও মসজিদে পুড়িয়ে মারা হয় এবং কেবল মুসলমানদেরই গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মুসলমানরা কি কুরবানি ত্যাগ করবে?: ভারত উপমহাদেশের হিন্দুরা এতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত যে, (আল্লাহ না করুন) যদি ভারতের সমস্ত মুসলমানকে তাদের অত্যাচারের কারণে হত্যাও করা হয়, তবুও তারা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের ধর্ম ও দায়িত্ব—কর্তব্য ত্যাগ করবে না। জীবনের ভয় বা সম্পত্তির বিপদ তাদের কর্তব্য পালন থেকে বিরত রাখতে পারে না। তারা বিশ্বাস করে যে, ন্যায়পরায়ণতা, সৎকর্ম, সত্যের সমর্থন এবং ধর্মীয় বিধি—বিধান পালনে মৃত্যুবরণ করা, বিধর্মীদের নিকট অপমানজনক জীবন যাপনের চেয়েও লক্ষ গুণ শ্রেয়। সুতরাং হিন্দুদের হত্যা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই কুরবানি বন্ধ করা যাবে না, এটি মুসলমানদের আইনসম্মত অধিকার এবং তারা নিজেদের সীমার মধ্যে সতর্কতার সাথে তা পালন করে। বিধর্মীরা এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা চরম নিষ্ঠুরতা ও অবিচার। কী আশ্চর্য যে, একটি জীব হত্যার অপরাধে মুসলমানদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, অথচ লক্ষ লক্ষ হিন্দু যখন একই কাজ করে, তখন তাদের দিকে কেউ চোখ তুলেও তাকায় না।
হিন্দুদের মধ্যে এই আবেগ কে সৃষ্টি করেছে?
কারো নিকট একটি প্রশ্ন জাগ্রত হতে পারে যে, হিন্দুদের মধ্যে মুসলিম হত্যার এই উন্মাদনা কে তৈরি করেছে? আর এই প্রশ্নটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। উত্তরটি স্পষ্ট যে, এই উন্মাদনা অতীতের হিন্দু—মুসলিম ঐক্যই এটি তৈরি করেছিল। যার পতাকা স্বাধীনতার খিলাফত কমিটির যুগে উত্তোলন করা হয়েছিল এবং তথাকথিত মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতারা মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল যে, আমরা হিন্দুদের সঙ্গে একতাবদ্ধ। গো—হত্যা বন্ধ করুন। সেই যুগের অর্থলোভী তথাকথিত মৌং এই বিষয়ে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও রক্তপিপাসু বক্তৃতা দিতো। হাকীমুল উম্মত মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি খুবই সুন্দর বলেছেন,
اے باد صبا ایں همه آورده تست
অর্থাৎ, হে প্রভাতের বাতাস, তুমিই এই সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছ ।
নেতা ও বক্তাদের ভাষণ হিন্দুদের মধ্যে এক উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। ঐক্যের সেই প্রদর্শনী কয়েক দিনও স্থায়ী হয়নি; এর বিষাক্ত প্রভাব আজও রয়ে গেছে।
একজন মুসলমানের কি করা উচিত?
বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসলমানদের উচিত, তাদের অধিকার রক্ষায় তাদের প্রাচীন শান্তিপূর্ণ পন্থাকে দৃঢ়ভাবে মেনে চলা। যারা মুসলমানদের নেতৃত্বের জন্য এগিয়ে আসে, নেতৃত্বের দাবিদার হয়, নেতৃত্ব দাবি করে এবং যারা মুসলমানদের কাছ থেকে ভোট পেয়ে সরকারে সম্মানজনক আসন পায়, তাদের উচিত মুসলমানদের জীবন, সম্পত্তি, শান্তি ও কল্যাণ রক্ষার জন্য নিয়মিত ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালানো। কিন্তু ঐ সঙ্গীদের নির্দয় আচরণ শত্রুর নৃশংস আক্রমণের চেয়ে কম নয়। মুসলমানদের মারধর করা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে, কিন্তু এই স্বার্থলোভীরা জানেই না। মুসলমানদের সমর্থনে মুখ খোলার সাহস তাদের নেই। যদি তারা হিন্দুদের শক্তিতে এতই ভীত হয়, তবে তাদের মুসলমানদের নেতৃত্ব দিতে ও প্রতিনিধিত্ব করতে এগিয়ে আসা উচিত নয়, এবং ভবিষ্যতে মুসলমানদেরও এমন অযোগ্য ও কাপুরুষ ব্যক্তিদের সামনে আনা উচিত নয়, যারা প্রয়োজনের সময় মুসলমানদের কোনো কাজেই আসে না। (আসসাওয়াদুল আজম, যিলহজ্ব—১৩৪৬ হিজরি, পৃষ্ঠা ২—৮;মকালাতে সদরুল আফাযিল,পৃ.২৮১—২৮৮)
ঈদুল আযহা শুধু পশুবলি নয়, বরং এটি নিজের ভেতরের আমিত্ব বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালনের এক চরম পরীক্ষা। বর্তমান মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, দয়া এবং ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে এই উৎসব অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। মহান রাব্বুল ইজ্জত আমাদের নির্যাতিত ঈমানী ভাইদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন বিজাহিন নবিয়্যিল আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

কোন মন্তব্য নেই