হযরত নুরুল আবছার শাহ খলিলনগরী (ক.) এর জীবন ও কর্ম
শুভ জন্মক্ষণ
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার অন্তর্গত ১১নং ফতেপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ফতেপুর গ্রামে খলিল মুন্সির বাড়ীতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৩৭ সালের এক শুভক্ষণে জন্মগ্রহণ করেন যুগবরেণ্য মহ্ান তাপস হযরত শাহসুফী মুহাম্মদ নুরুল আবসার শাহ খলিল নগরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। মরহুম ইসলাম আহমদ কোম্পানি তাঁর সম্মনিত পিতা এবং তাঁর মাতার নাম হাজেরা খাতুন। তাঁর পিতামহ মরহুম মিয়াজান সারাং ছিলেন নেতৃত্ব স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের অন্যতম।
শিক্ষা জীবন
যে দুনিয়ার প্রতি উদাসীন ও অনাসক্ত হয়, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন ছাড়া জ্ঞান দান করেন। আর প্রকশ্যে উপায় ব্যতিত সঠিক পথে পরিচালনা করেন,তাঁকে দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন করে দেন এবং তার থেকে মূর্খতা দূরীভূত করেন। সেই পথের পথিক দাদাজান নুরুল আবসার শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বাল্য বয়সে নিজ গ্রামে অবস্থিত ফতেপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন। পরবর্তীতে যুগশ্রেষ্ঠ আরেফ বিল্লাহ হযরত খলিল শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহির সংস্পর্শে থেকে ইলমে লাদুন্নী লাভে ধন্য হন এবং মারফতের উচ্চস্বরে পৌছতে সক্ষম হন। এজন্য আল্লামা রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এক মুহুর্ত আল্লাহর ওলীর সান্নিধ্যে অবস্থান করা হাজার বছর লৌকিকতা মুক্ত ইবাদত করার চেয়ে শ্রেয়।”
কর্মজীবন
ইরশাদ হচ্ছে—তোমরা ভূপৃষ্টে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো (জীবিকা অর্জনের কাজে লিপ্ত হয়ে যাও) আর আল্লাহকে খু্ব স্মরণ করো! এ আশায় যে সাফল্য লাভ করবে । মহান আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক অন্বেষণের উক্ত নির্দেশনা পালনে পরিবারের অভাব দূর করতে এবং ভাই—বোনদের ভরণ—পোষণে পিতা মহোদয়কে সাহায্যে করার মানসে তিনি কর্মজীবনে আত্মনিয়োগ করেন। পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে ড্রাইভিংকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন । আর এক্ষেত্রে পারদর্শ্বিতার স্বাক্ষর রেখে ১৯৬৩ মতান্তরে ১৯৬৪ সালে ড্রাইভিং লাইন্সেস লাভ করেন এবং বেশ কিছুদিন চট্টগ্রাম—নাজিরহাট লাইনে গাড়ী চালান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাস্ট ক্লাস ড্রাইভার পদে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সাথে গাড়ী চালান। মাঝখানে কিছুদিন অব্যাহতি নেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ চাকুরীতে পুনঃরায় যোগদানের জন্য বারংবার চিঠি প্রেরণ করলে ৫/৬মাস গাড়ী চালিয়ে চিরদিনের জন্য এ পেশা ছেড়ে দেন।
আধ্যাত্মিক জীবন
দাদাজান নুরুল আবসার শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি যুগশ্রেষ্ঠ কলন্দর হযরত শাহসুফী সৈয়্যদ মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাইজভান্ডারীর খুবই ভক্ত আশেক ছিলেন। তিনি প্রায় সময় কুলগাঁওস্থ খলিল ভান্ডার দরবার শরীফে হুযূরের সাক্ষাতে আসতেন। হুযূর বাকরখানি ও দুধ বেশি পছন্দ করতেন,তাই যখনই আসতেন সঙ্গে হয়তো বাকরখানির পেকেট থাকতো নতুবা দুধ। অন্যান্য ভক্তবৃন্দের মতো এসে আদব সহকারে মনের আরজি পেশ করে দোয়া নিয়ে চলে যেতেন। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে একদিন দাদাজান খলিলনগরী পারিবারিক কলহের কারণে মামলা মুকাদ্দমার শিকার হন। এ বিষয়টি সমাধান কল্পে হুযূরের দরবারে হাজিরা দেন। কিন্তু ঐ দিনের দৃশ্যটি একদম ব্যতিক্রম। তিনি প্রবেশ করে সালাম কালামের পর খলিল শাহ হুযূর তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন এবং বললেন, ফায়সালা ওই যাইবো (অর্থাৎ সমাধান হয়ে যাবে)। “হুযুরের দোয়া নিয়ে তিনি বাড়ী ফিরে আসেন।
আল্লাহর লীলা খেলা বুঝা বড়ই কঠিন ব্যাপার। বাড়ি ফিরে আসার পর থেকে তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ক্রমশঃ মযজুব হয়ে উঠেন। শুরু হয় রিয়াজত। দাদাজান খলিলনগরীর অবস্থার পরিবর্তনের রহস্য লোকেরা বুঝতে অক্ষম হয় এবং পাগল হয়ে গিয়েছে মনে করেছে। ১৯৭৭সালের প্রারম্ভে তাঁর ফুফাতো ভাই কাদের বক্স তাঁকে চিক্ষিৎসা করানোর জন্য পাবনার পাগলাগারে নিয়ে যান। কাদের সাহেব তাঁকে পথিমধ্যে দেখেন ওখানে রেখে গাড়ী চালিয়ে আসছেন। আর তিনি তাঁর গাড়ীর পিছনে ঝুলে চলে এসেছেন। পুনরায় তাঁকে আবার পাবনার পাগলাগারে নিয়ে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে কাদের বক্স বললেন, আপনাদেরকে বললাম ওনাকে আপনাদের পাগলাগারে সুস্থ করে তোলার জন্য। আর আপনারা তাঁকে ছেড়ে দিলেন। কতৃপক্ষ বললেন, আবসার সাহেব তো একজন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি। তাঁর চলা—ফেরা তো আমাদের এখানে স্বাভাবিকই ছিল। অতঃপর তাঁর এ বিষয়ে কোনো তদবীর করা হলো না। দীর্ঘ পাঁচ বৎসর জালালী হালতে ছিলেন। ১৯৮০সালের শেষ দিকে তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা ইসলাম আহমদ ইন্তেকাল করেন। এরপর তিনি ক্রমান্বয়ে সালেক অবস্থার দিকে ফিরে আসেন এবং সাংসারিক জীবনে আত্ননিয়োগ করেন।
বৈবাহিক জীবন
রাসূলে আরবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, বিবাহ করা আমার সুন্নাত। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে আমার দলভূক্ত নয়। প্রিয়নবীর উক্ত সুন্নাত আদায়ের লক্ষ্যে পারিবারিক সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম হাটহাজারী উপজেলার অন্তর্গত ফতেপুর গ্রামের লতিফ পাড়া নিবাসি ঠান্ডা মিয়া সারাং এর বাড়ির মৌলভী মুহাম্মদ ইউনুস ও মজুরা খাতুন এর বড় কন্যা মরিয়ম খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮৩/১৯৮৪ তাঁর ওরশে প্রথম কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ এবং শিশু অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। বর্তমানে ০৭ জন সন্তান—সন্তুতি জীবিত আছেন। যথাক্রমে নূর বেগম, নূর বানু, নূর নাহার, ওহিদুর রহমান, আজিজুর রহমান, নুর জাহান, হাবিবুর রহমান এবং আবদুর রহমান। তাঁর স্ত্রী দাদীজান মরহুমা ৪ মার্চ ২০১৪ সালে ইহকাল ত্যাগ করে মহান প্রভূর সান্নিধ্যে গমন করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। তাঁকে খলিল নগর দরবারস্থ হযরত শাহসূফি সৈয়দ মুহাম্মদ খলিলুর রহমান বি.এ. বি.টি মাইজভান্ডারী রহমাতুল্লাহি আলাইহির আস্তানা শরীফের উত্তর পার্শে দাফন করা হয়।
মাসিক মাহফিল প্রচল
১৯৭৫ সাল থেকে দাদাজান খলিলনগরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রতি বাংলা মাসে ১ম তারিখ মাসিক মাহফিলের আয়োজন করে আসছেন। মোনাজাত শেষে উপস্থিত ভক্তবৃন্দের হালুয়া—রুটি বিতরণ করা হতো। প্রাথমিকভাবে তা ছিল ঘরোয়া পরিবেশে। ১৯৭৮ সালের ২২ অক্টোবর মোতাবেক ১৩৮৫ বাংলা ৪ কার্তিক রবিবার তাঁর মুর্শিদ কেবলা হযরত খলিল শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইন্তিকাল করার পর থেকে এ মাহফিল অত্যন্ত ঝাঁকঝমকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তবৃন্দ দূর—দূরান্ত থেকে এসে উক্ত অনুষ্ঠানে নিয়মিত যোগদান করেন এবং ছাগল জবেহ করে তাবারুক উপস্থিত সকলের মাঝে বন্টন করা হয়। আর এতে যুক্ত করেন সেমা—মাহফিল। অত্যন্ত আদব সহকারে এত হামদ বারি তায়ালা নাতে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানকাবাতে আউলিয়ায়ে কেরাম পাঠ করা হয়। যা পরবর্তীতে খলিল নগর দরবারে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে বাবজান খলিল নগরীর অসিয়ত অনুসারে কার্তিক ও মাঘ মাসের ফাতিহা শরীফ ১ কার্তিক ও ১ মাঘ এবং অন্যন্য মাসের প্রথম সোমবার বাদে ফজর হতে আরম্ভ হয়ে যোহরের নামাজের পর আখেরী মোনাজাত ও তাবারুক বিতরণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আর শুধু মাত্র রমজান মাসের ফাতিহা শরীফ রাতে অনুষ্ঠিত হয়।
হিযরত
ইরশাদ হচ্ছে—যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হিযরত করবে,তার হিযরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দরবারে গৃহীত হবে। যুগে যুগে নবী—রাসূল,আউলিয়ায়ে কেরাম ইসলামের শ্বাশতবাণী প্রচারের লক্ষ্যে আপন মাতৃভূমি ত্যাগ করে বিরাণ ভূমিতে হিযরত করেছেন। অনুরুপভাবে প্রতিকূল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৭সালে হিযরতের স্থান নির্ণয়ে রাউজান গমন করেন এবং ১৯৮৮সালে পূর্ব রাউজানের রশিদের পাড়াস্থ লালীর বাপের বাড়ী নিবাসী মরহুম হামদু মিয়া সওদাগরের স্ত্রী ও তার ছেলের নিকট থেকে ৪০ শতক বসত—বাড়ীর জায়গা ক্রয় করে সেপ্টেম্বরে সপরিবারে হিযরত করেন। আর এর নামকরণ করেন খলিল নগর। যা বর্তমান ২১২ শতক আয়তনের কমপ্লেক্স।
খানেকাহ
১৯৭৮/৭৯ সালে দাদাজান খলিল নগরী আপন মুর্শিদের স্মৃতি বিজড়িত ফতেপুরে স্থাপন করেন খলিল শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহির স্মৃতি স্মারক খানেকাহ। পরবর্তীতে রাউজান চারা বটতলস্থ খলিল নগর দরবারে যখন দাদাজানের সাথে সাক্ষাতের জন্য ভক্তবৃন্দগণ দূর—দূরান্ত থেকে আসতে শুরু করে এবং ক্রমান্বয়ে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, ফলে তাদের জন্য স্থাপন করা হয় বৈঠক খানা (খানেকাহ), মহিলাদের জন্যও পৃথকভাবে ব্যবস্থা করা হয়। শুক্রবার ব্যতিত প্রতিদিন সকাল ১০ টায় আশেক, ভক্তবৃন্দ, বিপদগ্রস্থ ও অসহায় ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ দিয়ে তাদের মনের আশা, আর্জি পূরণে মহান প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনায় মনোনিবশ করতেন। প্রথমে পুরুষদের সময় দিতেন অতঃপর মহিলাদের সময় দিতেন। সকলের জন্য সাধ্যমত আপ্যায়নের ব্যবস্থাও করা হতো।
মসজিদ, আস্তানা ও মাদরাসা নির্মাণ
ইরশাদ হচ্ছে, যে ব্যাক্তি আল্লাহর জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন। আশেক ভক্তবৃন্দের আর্জি পূরণে জিয়ারতের সুবিধার্থে ১৯৯২ সালের শেষ দিকে খলিলনগর দরবারে শাহসূফি হযরত খলিলুর রহমান শাহ বিএবিটি মাইজভান্ডারী (ক.) এর আস্তানা শরীফের নির্মাণ কাজ বাবাজান খলিল নগরীর নির্দেশে শুরু করা হয় এবং ১৯৯৩ সালে তা সম্পন্ন হয়। অতঃপর এলাকাবাসী ও ভক্তবৃন্দ পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমার নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে ১৯৯৪ সালের শেষ দিকে খলিলিয়া আজিজিয়া তৈয়্যবিয়া ভান্ডারীয়া জামে মসজিদ নির্মাণ কাজ শূরু করেন এবং ১৯৯৬ সালের শেষ দিকে তা সম্পন্ন হয়। অতঃপর এলাকার জনসাধারণের শিশু, বালক—বালিকারা মহাগ্রন্থ কুরআনুল করিমের শিক্ষার্জনের সুবিধার্থে ২০০০/২০০১ সালে নির্মাণ করেন খলিলিয়া আজিজিয়া তৈয়্যবিয়া ভান্ডারীয়া ফোরকানিয়া মাদরাাসা। ঐশীবাণী আল কুরআনের শিক্ষাদান প্রসঙ্গে হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে কুরআন মাজিদ নিজে শিখে এবং অপরকে শিক্ষা দান করে।
চরিত্র ও আদর্শ
দাদাজান খলিল নগরী ছিলেন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার মহান চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। কথা—বার্তা, চাল—চলন, আচার—আচরণ, উদারতা—দানশীলতা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা, দৃঢ়তা, স্থিরতা, সত্যবাদিতা, ন্যায়—পরায়ণতা ও আতিথেয়তা প্রভৃতি গুণাবলী তার জীবনে পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হয়েছিল। তিনি দুনিয়া বিমুখ, পরহেজগার ও স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। অন্যায়—অবিচার, মিথ্যা, কপটতা, অত্যাচার, পাপাচার, তোষামোদ ও দূর্ব্যবহার প্রভৃতি মন্দ গুণাবলি তার চরিত্রকে বিন্দু পরিমাণ কলুষিত করতে পারেনি।
কারামত
আউলিয়ায়ে কেরামের জন্য কারামত গোপন করা পূর্বশর্ত। তাই তারা তাদের ইচ্ছে মত কারামত প্রকাশ করেনা। বরং যথাসম্ভব নিজেকে গোপণ করতে চান। তবে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় বান্দাদর কল্যাণ সাধনে তার ওলির সম্মান বৃদ্ধির জন্য সময় সময় কারামত প্রকাশ করে দেন। হযরত নুরুল আবছার শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজেকে অত্যাধিক গোপন রাখার চেষ্টা করতেন। এই মহান তাফসের জীবনেও ঘটেছে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা। যথাযত সংরক্ষণের অভাবে এর অনেক গুলো আজ স্মৃতি বিস্মৃত। এরপরও চেষ্টা যতটুকু জানা গেছে তা আজকের প্রজন্মের সম্মুখে তুলে দরার প্রয়াস চালাবো।
শূণ্য থেকে বিত্তবান
ফতেহপুর হেলাল চৌধুরী পাড়া নিবাসী এক ইসলামী ভাইয়ের বর্ণনা, আমার কিশোর বয়সে একদিন এম.কে রহমানিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্মুখস্ত দোকানের সামনে বাবাজান খলিলনগরী দাঁড়িয়েছিলেন।এ সময় আমি বিলের মাঝখানে (যেখানে বর্তমানে গরুর হাট বসে) ছিলাম। আমাকে দেখে ডাক দিলেন। আমি নিকটে আসলে তিনি পার্শ্বস্থ দোকান থেকে বেশি পরিমাণে চানাচুর দিয়ে বললেন: বুবু কিছু খাবে, কিছু জমা রাখবে এবং কিছু বিলি করার জন্য বলবে। আমি অনুরূপ আমার মা জননীকে বললাম। অতপরঃ আল্লাহর অশেষ রহমতে বাবাজান খলিল নগরীর কৃপা দৃষ্টিতে আমার ভাগ্য পরিবর্তন হল। বিদেশ গমণ করি এবং সেখানে ভাল অবস্থান তৈরী হওয়ায় এলাকার আত্মীয়—স্বজন, বন্ধু—বান্ধবকে বিদেশে নিয়ে যায়। প্রবাস জীবনে সকলের নিকট এক নামে (মাহাবুব মেকানিক) পরিচিতি লাভ করি। কর্ম ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করি। এখনও আল্লাহর রহমতে অনেক সুখে শান্তিতে আছি। চট্টগ্রাম শহরে কোটি টাকার সম্পত্তি আছে। আলহামদুলিল্লাহ।
তেল ছাড়া গাড়ি চলে
রাঙ্গামাটি জেলার বেতবুনিয়া নিবাসি মনসফ আলী সাহেব বর্ণনা করেন, রাউজান গহিরা নিবাসি মরহুম আবুল হাশেম সাহেব একদা খলিল নগরী হুজুরকে নিয়ে মোটর সাইকেল যুগে মাযার যেয়ারতে বের হলেন। প্রতিমধ্যে নোয়াপাড়া পথের হাটে আসলে গাড়ির তেল ফুরিয়ে গেলেও সেখান থেকে কাগতিয়া আলিয়া মাদ্রাসা—চিকদাই দরবার শরীফ—মাইজভান্ডার দরবার শরীফ তেল ছাড়া ঐ মোটর সাইকেল দিয়ে ভ্রমণ করেন এবং যেয়ারত সম্পন্ন করেন।
সন্তানহীন সন্তান লাভ
নাঙ্গলমোড়া নিবাসি আবদুল আলীম সাহেব বর্ণনা করেন, একদা আমি বাবাজান খলিলনগরীর নিকট অবস্থান করে মনে মনে কল্পনা করছি মাইজভান্ডার দরবার শরীফে মানুষ গরু নিয়ে যায়, মহিষ নিয়ে যায়, আর আমরা মাত্র চারটি ছাগল জবেহ করছি। এটা কল্পনা করার সাথে সাথে বাবাজান বলতে লাগলেন, “ওয়া তোয়ার নানা যেদুগুন পোয়া দান গরজি, যদি ওগু মাইনশে ওগু ওগু পোয়ার বিনিময়ে ওগু ওগু মইশ আনে দই, এই এরিয়াত জায়গা দিত তারিবেনা” অর্থাৎ ওহে! তোমার নানাজানের উসিলায় মহান আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে সন্তান দান করেছেন, যারা সন্তানের আর্জি নিয়ে খলিল নগর দরবারে এসেছিল। যদি তারা প্রত্যেকে একটি সন্তানের বিনিময়ে একটি করে মহিষ আনে তবে এই খলিল নগর দরবারের সীমানাই জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়।
কুলগাঁও জে. বটতল নিবাসী এক নব দম্পতি দীর্ঘদিন যাবৎ ছেলে সন্তান না হওয়ায় কুলগাঁওস্থ বাবাজানের এক ভক্তের সাথে পরামর্শ করলে, তিনি তাকে বাবাজান খলিলনগরীর নিকট গমন করে আরজি পেশ করার পরামর্শ দেন। ঐ দম্পতি তার কথা মতো একদিন সময় করে খলিল নগর দরবার শরীফে গিয়ে বাবাজান খলিল নগরীকে তাদের মন—বাসনা পূরণ হওয়ার জন্য দোয়ার দরখাস্ত করেন। অতঃপর বাবাজান তাদেরকে মনের আশা পূরণ হলে দরবারের মাসিক ফাতেহায় শরীক হওয়ার নিয়ত করতে বলে দোয়া করে বিদায় দেন। দোয়ার বরকতে তাদের দীর্ঘদিনের মনের বাসনা পূরণ হয়, অন্ধকার ঘরে প্রদীপ জলে উঠে। তাদের ঔরশে একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। আলহামদুলিল্লাহ।
একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে জুমার নামায আদায়্
বেতবুনিয়া নিবাসী জনাব মনসফ আলী সাহেব বর্ণনা করেন, প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা/১০:৩০ মিনিটে বাবাজান খলিল নগরী দরবার থেকে বের হয়ে যেতেন। লোকেরা সমালোচনা করে বলত— শুক্রবারে মানুষ বাড়িতে থাকে, জুমার নামাজ আদায় করে। তাঁর নিকট দূর—দূরান্ত থেকে মানুষ আসে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মসজিদে জুমার নামায আদায় করার জন্য। কিন্তু তিনি কোথায় যান? তাই অনেকে তা যাচাই করার জন্য তাঁর পিছনে পিছনে গমন করে। বণিক পুকুর কিংবা তার পশ্চিমে কিছুদের যাওয়া পর্যন্ত লোকজন তাঁকে দেখতে পায়। অতঃপর চোখের পলক পড়তে কিংবা দৃষ্টি ফিরাতে তাঁকে দেখতে পায় না। অতঃপর আগুন্তুক কেউ বলে আমি তাঁকে মাইজভান্ডার দরবার শরীফে জুমার নামায পড়তে দেখেছি। কেউ বলে আমি ফতেপুর দরবারে নামায পড়তে দেখেছি, কেউ বলে আমি তাকে লালিয়াহাটের পশ্চিমে নামায আদায় করতে দেখেছি। আবার জুমার নামায শেষ ৩০/৪০ মিনিট পর লোকজন তাঁকে আবার হুজরার বারান্দায় দেখতে পান। মূলত মহান আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন আউলিয়ায়ে কেরাম একই সমেয়ে একাধিক স্থানে বিচরণ করতে পারেন। যা তাঁদের জীবনী অধ্যয়ন করলে জানা যায়। আর বর্তমান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। আল্লাহর সৃষ্টি মানব তাদেরই তৈরীকৃত আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে একটি স্থানে বসে সাংবাদিক সংবাদ পরিবেশন করলে তা যদি মিডিয়ার মাধ্যমে সারা বিশ্বে প্রচার করা যায়, মহান আল্লাহর আদেশ পালনে হযরত আজরাঈল আলাইহিস সালাম একই দিনে, একই সময়ে, একই ঘন্টায় শতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, মুনকার—নকীর ফেরেস্তাদ্বয় একই সময়ে যদি অসংখ্য মানুষের কবরে গিয়ে সাওয়াল—জাওয়াব করতে পারে,তবে আশরাফুল মাখলুকাত খ্যাত মানবজাতির উচুস্তরের নিয়ামত প্রাপ্ত মহামনীষিদের জন্য এ কাজটি অতিব সহজতর বিষয়,যা কুরআন—সুন্নাহ সম্মত।
উত্তেজিত মহিশ নতজানু হয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন
নাঙ্গলমোড়া নিবাসী এক ইসলামী ভাই বর্ণনা করেন, একদা অধম বাবাজান খলিল নগরীর সফর সঙ্গী ছিলাম। হুযূর আমাকে সঙ্গে নিয়ে মাইজভান্ডার শরীফ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে গমন করলেন। আমরা হযরত কেবলা ও বাবাভান্ডারী (ক.)এর রওযা যিয়ারত সম্পন্ন করে মাইজভান্ডার দরবার শাহী জামে মসজিদের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আর কিছু লোক বাজনা বাজিয়ে একটি মহিষ নিয়ে দরবার শরীফের প্রধান ফটক অতিক্রম করছিলো। হঠাৎ মহিষটি উত্তেজিত হয়ে দৌড় দিলো। লোকজন ভয়ে এদিক সেদিক পলায়ন করলো। কিন্তু মহিষটি যখন বাবাজান খলিল নগরীর (ক.) সামনে আসল তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে গেলো এবং মস্তক অবনত করে সম্মান জানালো। তখন বাবাজান খলিল নগরী বললেন, ওয়া! দেক্ষুনি,বওত শিক্ষিত মইশ, মালিক আইশের থিয়েই গিয়ি। অর্থাৎ ওহে! দেখো, মহিষটি অনেক শিক্ষিত; মালিক আসার সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।
ম্যানেজার ভিখারীতে পরিণত
ফতেপুর নিবাসী এক ইসলামী ভাই বর্ণনা করেন, ইছাপুর নিবাসী টবাকো ইসলাম নামে পরিচিত জনাব ইসলাম সাহেব সিগারেট কোম্পানীর ম্যানেজার ছিলো। সে খুবই আত্ম অহংকারী ছিলো এবং অলী বিদ্বেষী ছিলো। সে যেখানে—সেখানে আউলিয়ায়ে কেরাম, মজযুব ব্যক্তিবর্গকে বিদ্রুপ করতো। বিশেষত সবুর ফকির ও আবসার ফকিরকে। সে বলে বেড়াতো কিছুদিন পূর্বে গাড়ীর ড্রাইভার ছিলো আর এখন ফকির দরবেশের বেশ ধরেছে। একদিন মদনহাট বাজারে আমি চাঁদপুরের ইলিশ মাছ ক্রয় করতে গেলাম। ইত্যবসরে সাক্ষাত হলো ইসলাম সাহেবের সাথে। আমরা উভয়ে মাছ ক্রয় করছি এমন আবসার মামা গিয়ে বললেন, “মাছ আয় নখাইয়ুম না, খালি তোরা খাবিদি।” অর্থাৎ মাছ আমি খাবো না ? শুধুই কি তোমরা খাবে। এ কথা বলতে না বলতে ইসলাম সাহেব ফকির সেজেছো? বলে দুই—তিন থাপ্পর মেরে দিলো মামাজানকে। আমি বললাম, তুমি এই কি কাজ করলে ? সে বললো, কথা বলিস না, কিসের ফকির? সব বেশ ভূষ, সব খাওয়ার ফকির। আমরা মাছ ক্রয় করছি আর সে কি বললো, দেখলি ? আমি বললাম, ভাই,যা করেছো,ভালো করোনি। আর মামাজান কিছু না বলে মার খেয়ে হেসে হেসে চলে গেলেন। সেই থেকে তার অধঃপতন শুরু হলো। তার ধন—সম্পদ, যেগুলো নিয়ে সে গর্ব করতো, সব শেষ হয়ে গেলো এবং এমন অবস্থা হলো যে, সে মানুষ থেকে যাকাত—ফিতরা গ্রহণ করছে। যেই ব্যক্তি বেনসন সিগিরেট খেতো, করাতী বলীর সাথে প্রতিযোগিতাকারী এখন ভ্যানগাড়ী চালাচ্ছে। এখনো যেখানেই মামাজানের কদম পড়েছিলো, সেখানে মস্তক অবনত করছে। আর বলে হায় ! আমি কি করলাম, ও বাবাজান! আমি কি করলাম। এখনো তাকে দেখা যায়, খলিল নগর দরবারে, চোখের পানি ফেলে ক্রন্দন করতে এবং আরজি পেশ করতে। বেয়াদবীর শাস্তি ভোগ করছে এখনো। এই জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ করেছেন,
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ
অথার্ৎ যে ব্যক্তি আমার বন্ধুর (আউলিয়ায়ে কেরাম) সাথে শত্রুতা পোষণ করলো, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি।
পাপী ব্যক্তির বেলায়ত লাভ
ফতেপুর জোবরা নিবাসী আবদুল মালেক (উদ্দে মালেক নামে পরিচিত) পাহাড়ের বাঁশ কেটে এনে মদনহাট—ইসলামিয়ারহাট বাজারে বিক্রি করতো এবং টাকা—পয়সা যা ইনকাম করতো,তা দিয়ে মাদক সেবন করতো,পরিবার—পরিজনের খবর রাখতো না। এ অবস্থায় অর্ধেক বয়স শেষ করে দিয়েছে। পরবর্তীতে বাবাজান খলিল নগরীর সংস্পর্শে আসে। খলিল নগর দরবারের মাসিক মাহফিলের আগন্তুক কাওয়ালদের বখশিশ দেওয়ার অর্থকরী তার কোমরে থাকতো এবং সে তা থেকে কাওয়ালদের বখশিশ প্রদান করতো। গায়করা বলতো, তুমি পরিবার—পরিজনকে না দিয়ে আমাদেরকে দিলে হবে? এতগুলো টাকা তুমি পাও কোথায়? আরেকদিন খলিল নগর দরবারে ইছাপুর নিবাসী বাঁচা ফকিরের সাথে তার ঝগড়া লেগে গেলো, তিনি বললেন, হে মালিক! কি করছো তুমি। আরো যা তা বললেন। তখন বাবাজান খলিল নগরী রেগে গিয়ে সবাইকে উত্তম মাধ্যম দিলেন। অতঃপর বাবাজান বললেন, “মালিককের চিন্তা তোরা কা গরর, ইতে মালিক, মালিক ন না, ইতের বাড়িত বিল্ডিং উড়িবো, ইতের বাড়িত বিল্ডিং উড়িবো। খৈল্লে ইতের বাড়ির বিল্ডিং গরম পরিবো।” অর্থাৎ তোমরা আবদুল মালেকের চিন্তা কেন করছো? সে তো মালিক। তার বাড়ীতে দালান—বাড়ী হবে, তার বাড়ীতে দালান— বাড়ী হবে, খলিল তার বাড়িতে বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে। সত্যিই বাবাজান খলিলনগরীর নজরে তার ভাগ্য পরির্তন হয়ে গেলো। সে আর সাধারণ মানুষ রইলো না। অলীদের দপ্তরে তার নাম উঠে গেলো, কামেল বুর্যগ হয়ে গেলো। এখন তাঁর বাড়ীতে মহা ধুমধামে তাঁর নামে ওরশ হয়। প্রতিবছর অনেক ভক্তবৃন্দ তাঁর দরবারে জমায়েত হয়ে যিয়ারত করে অবিরাম। এই জন্য আল্লামা জালাল উদ্দীন রুমি বলেছেন,
ايک زمانہ صحبت بأولياء— بہتر از صد سالہ طاعت بے ريا
অর্থাৎ এক সেকেন্ড এক মুহর্তের জন্য হক্কানী—রব্বানী আলেম, অলী—আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করা, শত শত বছরের লৌকিকতা মুক্ত ইবাদত থেকে অনেক উত্তম। তিনি আরো বলেন,
مولوی ںشد مولایے روم— تا غلام شمس تبریزی ںشد
অর্থাৎ আমি (মাওলানা রুমি) ততক্ষণ পর্যন্ত রোম স¤্রাজ্যের (পারস্য) বিখ্যাত আলেম হইনি, যতক্ষণ না শামসুত তীবরিযের দাসত্ব করেছি।
মাংস ঝড়ে পড়লো
ফতেপুর নিবাসী মুহাম্মদ হানিফ সাহেব বর্ণনা করেন,হেলাল পাড়া নিবাসী মরহুম সত্তার মিস্ত্রির ছেলে আবু হোসেন প্রথমে ফতপুর দরবার শরীফে বশর মাষ্টারের মুরিদান ছিল। কিন্তু দূভাগ্য বশত ওহাবী মতাদর্শে দীক্ষিত হয়ে হাটহাজারী কওমী মাদরাসার সাবেক পরিচালক মুফতী আহম্মদ শফীর হাতে বায়আত গ্রহণ করে। অতঃপর একদিন তাদের বাড়িতে একটি মাহফিলের আয়োজন করে এবং শফী সাহেবকে দাওয়াত দিয়ে তার মাধ্যমে মাহফিল সম্পন্ন করে। পরের দিন বাবাজান খলিল নগরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি আবু হোসেনকে বললেন,ও মতো ভাই! খালিয়ে ইন তুই কিল্লি দি? অর্থাৎ হে মামাতো ভাই! গতকাল তুমি এগুলো কি করেছো? জবাবে আবু হোসেন বললো, তোমরা যা করো, তা সব পাগলামী। এগুলো কোনো কাজ নই, এগুলো সব শিরিক, বেদআত..। তখন বাবাজান খলিল নগরী বললেন,“ও— তুই ইয়া ভালা কাম গইজ্জুজ”। অর্থাৎ তাহলে তুমি ভালো কাজ করেছো? অতঃপর আবু হোসেন অসৌজন্যমূলক আচরণ শুরু করলো এবং বাজে মন্তব্য করতে লাগলো। আর বাবাজান বলতে লাগলেন, ওহ! আহ! আয় বেশি দুঃখ পাইদ্দি, ইন কি কদ্দে, তুই ও ভাই ইন কি কদ্দে? অতঃপর জালালী হালতে গিয়ে রাগান্বিত হয়ে বললেন, তুর গোস্ত ঝরি ঝরি পড়িবো। মইশের গোসত, গয়ালর গোসত, গরুর গোসত, ফতেপুরী শাহর ভিডেত খাইয্যে ইন বাইর অয়বো। অর্থাৎ ওহ! আহ! আমি বেশি ব্যাথা অনুভব করছি, এগুলো কি করছো তুমি! ভাই, এগুলো কি বলছো? তোমার শরীরের মাংস জরে জরে পড়বে। তোমার মাংস তুমি দেখবে জরে জরে পড়বে। তুমি পীর পরিবর্তন করে নতুন পীরের হাতে বাইয়াত হইয়াছো। তোমার মাংস শরীর থেকে জরে জরে পড়বে। মহিষের মাংস, গয়ালের মাংস, গরুর মাংস— যা ফতেপুর দরবারে খেয়েছো সব বের হবে। অতঃপর সত্যিই সে মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়ার পূর্বে কঠিন রোগে আক্রান্ত হলো এবং তার শরীর থেকে মাংস ঝরে ঝরে পরছে। তার পরিবার—পরিজন তার দূর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে তার সঙ্গ ত্যাগ করে চলে গিয়েছে। মৃত্যুর সময় তাকে কলা পাতার উপর রাখতে হয়েছে। এভাবেই তার মৃত্যু হল। (নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক)
বাদ্যকার অলীর নজরে সুরকার ও গীতিকার
ফতেপুর নিবাসি জনাব হানিফ সাহেব বর্ণনা করেন, ১৯৭৮ সালের দিকে বাবাজান খলিল নগরী (ক.) মজ্জুব হালতে ছিলেন। সকলে তাঁকে ভয় করতো। তখন প্রবাদ ছিলো ওরা মারলে মার আবসার পাগলের মার। অর্থাৎ তিনি কখন কাকে প্রহার করে তা বলা অসম্ভব। তাঁর পাশ দিয়ে মানুষ গমন করতো না। পাশ কেটে অন্য পাশ দিয়ে গমন করতো কিংবা কোথাও লুকিয়ে যেত, তিনি চলে গেলে বের হতো। এমন সময় একদিন আমি গাড়ি থেকে মদনহাটে নেমে পূর্ব দিকে যাচ্ছি আর তিনি পূর্ব দিক থেকে আসছেন। আমি তখন তাঁকে দেকে ভয়ে একপাশে চলে যাচ্ছিলাম। আমি তখন তবলা বাজাতাম। সাথে তবলা কাপড় দিয়ে মোড়ানো ছিল। আমাকে দেখ খুবই নম্র সুরে বললেন, ওয়া আজিয়ে এশার পরে খলিল মুন্সির বাড়ির ইসলাম ড্রাইভারর ঘরত আইবে। আর বা কাদের ও নুরুল হকরে লইবে। নুরুল হকরে ন ছিনো, ওয়া লইট্টে ফইররি। অর্থাৎ ওহে আজ রাতে ইশার নামাযের পর খলিল মুসির বাড়িস্থ ইসলাম ড্রাইভারের ঘরে আসবে। কাদের ও নুরুল হককে সাথে আনবে। নুরুল হককে ছিনেছ? সে লেট্টো ফকির । আমি বললাম জ্বি আচ্ছা! আতঃপর আমি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে কোন রকম রাজি করে ইশার নামাযের পর তিনজন একসাথে গেলাম। নিরবে ভয়ে ভয়ে তার ঘরের সামনে গিয়ে বললাম— ওহে মামা, এটা বলতে না বলতে তিনি বের হয়ে বললেন, ওয়া তোয়ারা আইশো না? আমি হাতের দিকে তাকালাম দেখলাম লাঠি আছে কিনা, দেখলাম না নেই। তারপর বললেন, ‘আয়য়ু গরত আইয়ু। ওয়া নুরু তোয়ার ভাই তারারে নাস্তা দো। আর বার দিয়েনে (হানিফ) তোয়ারারে ডাকাই দি, আজিয়ে বাংলার হ তারিখ ? আজিয়ে কি বার ?’ অর্থাৎ আসো, ঘরের ভিতর প্রবেশ করো। হে নূরু, তোমার ভাইদের নাস্তা দাও। আমার বাবা হানিফের দিয়ে তোমাদের ডেকে এনেছি, আজকে বাংলা মাসের কয় তারিখ? আমরা হিসেব করে দেখলাম, বাংলা মাসের ০১ তারিখ। তিনি বললেন, ‘এই তারিখ আর বা কাদেররে লেখিদিঅ।’ অর্থাৎ এই তারিখটি আমার বাবা কাদেরকে লিখে দিও। তখন আমাদের তিনটি সিলভারের বাটিতে কিছু কালো রঙ্গের পানীয় দেওয়া হলো। আমরা ভয়ে ভয়ে সেগুলো পান করলাম। অত্যন্ত মিষ্ঠি ও ঠান্ডা ছিল পানিগুলো। অতঃপর বললেন— ‘ওয়া নুরু, একখান চামচ দ চা চামচ ঔষধ খাইদে এইল্লে!’ অর্থাৎ হে নূরু, একটা চা চামচ দাও। তা নুরুল হক দিলেন। আর বললেন, ‘তুঁই ইবে দিয়েনে (সিল্ভার বাটি) বাজাইবে দে।’ অর্থাৎ তুমি এই চা চামচ দিয়ে বাটি উপর আঘাত করে বাজনা বাজাবে। (বাটিতে আঘাত করলে টন টন শব্দ হয় জুরি হিসেবে।) কাদের ফকিরকে বললেন, ‘তঁুই এবে বাজাইবে দে।’ অর্থাৎ তুমি এটা বাজাবে। কাদের ফকির বললেন, এটা তো ভেঙ্গে যাবে। তিনি বললেন, ‘পড়ি যক’। অর্থাৎ সমস্যা নাই। আর আমাকে বললেন, ‘ওয়া পড়, কালাম পড়। অর্থাৎ তুমি কালাম পরিবেশন কর। আমার শরীর থেকে ঘাম বের হলো। কারণ আমি কোন দিন কালাম পড়িনি। তবলা বাজিয়েছি কাউয়ালদের সাথে। আমি বললাম, আমি তো কালাম জানিনা। তিনি বললেন,‘যেইল্লে যান এইল্লে পড়’। অর্থাৎ যা জান তা পরিবেশন কর। তখন আমি হাসবি রাব্বি সাল্লাল্লাহ দিয়ে আরম্ভ করে বজল করিম মন্দাগীণীর কালাম পড়লাম। আমার মনে হচ্ছিল আমি ফতেপুরী শাহর দরবারে বসে আছি চোখ বন্ধ করে পড়লাম— কে তুমি আড়ালে থাকিয়া, করিলা আমার...। কালাম শুনে তিনি বললেন, দেক্ষুনি ওয়া কি সুন্দর গড়ি ফইজ্জি। ন জানি ন জানি হই হই। অর্থাৎ দেখ, জানি না বলে কত সুন্দর করে কালাম পরিবেশন করেছে। অতঃপর দেখলাম, মাথায় জট চুল ওয়ালা বুকে ক্রস শিকল পরিহিত দু’জন লোক আসলেন। আমরা দাড়িয়ে তাদেরকে সম্মান করলাম। তিনি আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে বললেন ‘আর পোয়ালোর মিক্কে খিয়াল রাইক্ষো’। অর্থাৎ আমার ছেলেদের দিকে খেয়াল রাখবেন। তারা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন আপনার নাম কি? আমি বললাম হানিফ। তখন তাদের একজন বললেন, তুমি তো ইমাম এবং অপরজন বললেন, তুমি তো কাউয়াল। অতঃপর তিনি আমাদের এই তারিখ মনে রাখতে বলে বিদায় দিলেন। এরপর থেকে প্রতি বাংলা মাসের এক তারিখ আমরা তিনজন যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে ছেমা মাহফিল সম্পন্ন করতাম। আমাদেরকে সম্মানীও প্রদান করতেন। তৃতীয় মাহফিলে আমাকে তবলা ক্রয় করার জন্য তৎকালীন ১২০ টাকা দিয়ে বললেন তবলার দোকানে গিয়ে প্রথম যেটিতে চোখ পড়বে সেটিই কিনবে। পরদিন সকালে শহরে গিয়ে তবলা ক্রয় করে মদনহাটে নামতেই দেখলাম বাবাজান খলিল নগরি (ক.) মদনহাটস্থ দীপক সওদাগরের দোকানে বসে আছেন। আমি তাঁকে গিয়ে তবলাটি দিলে তিনি আমাকে পছন্দ মতো এর কভার সেলাই করতে বলেন। টেইলার্সে গিয়ে কভার সেলাই করে খলিফাকে ২০ টাকা পারিশ্রমিক দিয়ে তাঁর কাছে গেলাম। এবার আমাকে বললেন এটা গলায় ঝুলিয়ে দুইটি বাঁশের টুকরা দিয়ে বাঁজিয়ে ১ নং গেইট থেকে জামতল পর্যন্ত ঘুরে আসো। আমি লজ্জাবোধ করে দাঁড়িয়ে আছি। অতঃপর রাগ করে তিনি নিজ কাঁদে নিয়ে বাঁজিয়ে ১নং গেইট থেকে জামতল পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করে সেখান থেকে নিজ বাড়ি খলিল মুন্সির বাড়িতে এসে সেখান থেকে নুরুল আলম ফকিরের বাড়িতে গিয়ে বললেন, ‘আরে মনার মা ডিরাইয়েদে, ও বদ্দা আই কেন গইজ্জুম, আরে মনার মা ডিরাইয়েদে’। অর্থাৎ আমাকে মনার মা প্রেরণ করেছেন, ও ভাই আমি কি করবো? আমাকে মনার মা প্রেরণ করেছেন। অতঃপর সেকান থেকে কাদের ফকিরের বাসায় গিয়ে বললেন, ‘আরে ভাত দে— ভাত খাইয়ুম’। অর্থাৎ আমাকে ভাত দাও, আমি ভাত খাবো। তখন দুপুর ১টা কিংবা ২ টা। আর উপস্থিত শিশু কিশোর সবাইকে সহ কাদের ফকিরের মা দুপুরের খাবার পরিবেশন করলেন। সঙ্গে ছিলাম অধম আমি, বশর ও উদ্দে মালেক। অতঃপর আবার সেখান থেকে মদনহাটের দীপক সওদাগরের দোকানে তবলা রেখে শুধুমাত্র আমাকে নিয়ে রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে ইজাহার মিয়ার চায়ের দোকানে গেলেন। সওদাগর বলল, আমার মামাকে চা দাও। তখন তিনি বললেন চা আমাকে নয় আমার বাবাকে বড় গ্লাসে চা দাও। অতঃপর অনেকগুলো পিয়াজু নিয়ে এক একটি চায়ে ভিজালেন। আর আমাকে বললেনে, এগুলো খেয়ে নাও। প্রহার করার ভয়ে সব খেয়ে নিলাম। অতঃপর ১২০ টাকা থেকে অবশিষ্ট ৩৯ টাকা সুন্দর করে প্যাকেট করে আমি তাঁকে দিলাম। অবশিষ্ট টাকা দেখে তিনি বললেন, এত বাজার করার পরও টাকা রয়ে গেছে ? আমরা সর্বত্র ঘুরলাম, খেলাম, আচ্ছা এগুলো তোমার কাছে রাখ। আবার এসে দীপক সওদাগরের দোকানে বসলেন। অতঃপর সবুর ফকির আসলে ন¤্র ও বিনয়ী প্রকাশ করে কুশল বিনিময় করলেন। সবুর ফকির কিছু দূর গেলে বাবাজান আমাকে ইশারা করে বললেন, অবশিষ্ট টাকা গুলো সবুর ফকিরকে দিয়ে আসো। আমি গিয়ে তাকে বিষয়টা খুলে বললাম যে,অবিশিষ্ট টাকাগুলো আপনাকে দিতে বলেছেন। তখন সবুর ফকির বললেন, বাকি ছিল যে, সেগুলো নাকি? আমি চুপ করে বিদায় নিলাম। তখন বাবাজন বললেন, দিয়ে এসেছ? কিছু বলছেন কি? আমি বললাম, টাকা নেওয়ার পর বলেছেন বাকি ছিল যে, সেগুলো কিনা? বাবাজান বললেন, কিছু বলনি কেন? যাও আবার যাও। বলবে জ্বি। এতক্ষণে সবুর ফকির রাস্তা পার হয়ে গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, বললেন কি জন্য আসছো আমি বুঝেছি। যাও, বলিও ১০ তারিখ পরশু। তখন এসে বললাম, জ্বী বলেছি। আর তিনি বলেছেন, ১০ তারিখ পরশু। এটা বলার সাথে সাথে তিনি উচ্চ স্বরে হেঁসে বললেন, ১০ তারিখ বলেছে? তোমরা সবাই ১০ তারিখ চলে আসবে। অর্থাৎ ১০ তারিখ সবুর ফকির মাসিক মাহফিল করেন। সেই মাহফিলের দাওয়াত দিলেন। মীর আহমদ কাউয়ালকেও দাওয়াত দেওয়া হলো। সেখানে সবাই গেলাম। মাহফিলে গিয়ে বাবাজান মীর আহমদ কাউয়ালকে বললেন, আমার বাবার (হানিফ) সাথে চলে আসবে। তখন মীর আহমদ আমাকে বললো, ইনি কে ? ওনাকে যেখানে সেখানে দেখি। গাড়ির আগে আগে চলে যায়। ওনার বাড়ি কোথায়? আমি বিস্তারিত খুলে বলার পর বললাম, বাংলা মাসের ০১ তারিখ আপনাকে দাওয়াত দিয়েছেন ওনার বাড়িতে যাওয়ার জন্য। অতঃপর ৬ষ্ট মাস থেকে মীর আহমদ কাউয়াল মাহফিলে গজল পরিবেশন করতে লাগলো। তখন সে তেমন প্রসিদ্ধ ছিল না। অতঃপর এরপর থেকে সে এতই প্রসিদ্ধ হয়ে গেল যে, সকলে তাকে এক নামে চিনে। অল্প শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যেক জায়গায় সুনামের সাথে গজল পরিবেশন করেন। আর পিয়াজু খাওয়ার পর থেকে আমার মনে হচ্ছে যে, কে যেন আমাকে বলেছে লিখ! তুমি লিখ। এরপর থেকে আমার মনে যা আসে আমি লিখতে থাকি। এখন কাউয়ালের সাথে তবলা বাজানোর জন্য যেখানেই যাই উপস্থিত শ্রোতা বলে আপনি কিছু পরিবেশন করুন। তখন মীর আহমদ কাউয়াল ও অন্যান্য কাউয়ালরা বলত, তুমিও গাও। আবদারের ফলে পরিবেশন করতাম। দেখা যেত কাউয়ালদের গুলোর চেয়েও আমার গুলো অনেক সুন্দর হচ্ছে। আর লিখে লিখে আমি আমার মা জননীকে জমা দিতাম। অতঃপর একদিন ফতেপুর দরবারে মাওলানা নুরুল ইসলাম হুজুরের সাথে দো হলে ওনি আমাকে বললেন, নাতি ডিউটি চালু হয়েছে? আমি তখনও লিখছিলাম। লিখে হুজুরকে দেখালাম— আমি যেদিকে তাকাই মেলে আঁখি, সদায় খোদার রুপটি নয়নে দেখি।... জিজ্ঞেস করলাম, দাদা এটা কেমন হয়ছে? তিনি এটা দেখার পর অনেক প্রশংসা করে বললেন, লিখ লিখ ঠিক আছে। আমি লিখে আমার মাকে দিতাম আর তিনি অজান্তে তা লাকড়ি হিসেবে চুলায় দিয়ে রান্না করতেন। আরেকদিন বাবাজান খলিলনগরী বললেন, আমার কাগজ কোথায়? তখন থেকে প্রায় ২ বছর আমি দেওলিয়া হয়ে সর্বত্র আমি কাগজগুলো খুঁজতে লাগলাম। এমনকি লোকের মুখে কাগজ ফকির নাম হয়ে গেলো। আমার জননী অনেক বৈদ্য ডাক্তার দেখালো কিন্তু আমি আমার অবস্থায় আছি। অবশেষে সবুর ফকির বলল, আমার মিয়াকে তুমি কি করছো? কি জন্য ডাক্তার এনে টাকা পয়সা নষ্ট করছো? এ কোন জীনের পাগল নয়। বরং আামর বাবাজানের পাগল। আমার মিয়া ভালো হয়ে যাবে। তার কাগজগুলো দাও নি, তুমি এটা কি কাজ করলে? আহ! আচ্ছা...অতঃপর সবুর ফকির আমাকে আস্তে আস্তে বললেন, এ রকম করলে কেমন হবে? আবার লিখে তোমার মামাকে (আবছার শাহ) দিবে। তিনি চেয়েছেন, তাঁকে আবার লিখে দিবে। আমি বললাম, আমি কাগজগুলো খোঁজেছি, সেগুলো নিয়ে যাব। তিনি বললেন, লিখে নিয়ে যাবে সমস্যা নাই। আবার লিখ। অতঃপর মনে হলো যেন বট গাছের মধ্যম ঢালে উঠে শুয়ে থাকলে ভাল লাগবে। কেউ কেউ বলে উঠল আরে পড়ে যাবে । হঠাৎ চোখ বন্ধ অবস্থায় আমার মনে হচ্ছে আমার মামা আমাকে বলছে, আমি পেয়েছি, আমার কাছে জমা আছে সেগুলো। আমার বুবু আমাকে দিয়েছে। আমার নিকট জমা আছে। তুমি আরো লিখ, এরপর আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে পড়লাম। এরপর ধান ক্ষেতের পথ ধরে তাঁর বাড়ী পৌঁছলাম। সেখানে না পেয়ে মনে হলো যেন ১ নাম্বর গেইটে পাবো। অতঃপর প্রস্থান করলাম। দেখলাম, চট/ ছালা গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঐ সময়ে তিনি যখন যেখানেই যেতেন, সেখানে মানুষের ভীড় পড়ে যেত। সেদিনও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। আমাকে দেখে হেসে দিলেন এবং বলেন, আমাকে ছেড়ে দু’বছর ছিলি কিভাবে? এ কি কান্ড? পিয়াজু খেয়ে এমন করতে হয়? আরে পিয়াজু খেয়ে এমন করতে হয়? সেগুলো আমার নিকট জমা আছে। লিখ লিখ, সেদিনও সাথে মালেক ছিল। মামা আমাকে আবারো পিয়াজু খেতে বললেন। আমি বললাম, না আমি কলা খাব। তিনি বললেন, নিজেও খাও অন্যদেরও দাও। অতঃপর সকলকে কলা পরিবেশন করলাম। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর অশেষ রহমতে ও মামাজান খলিল নগরীর দয়ার নজরের বদৌলতে আজ এ অবস্থানে (সুনাম ধন্য একজন কাউয়াল) আছি।
অন্তিমকালে ভবিষ্যৎবাণী
ফতেপুর নিবাসি হানিফ কাউয়াল বর্ণনা করেন, মামাজান খলিল নগরী (ক.) ইন্তেকালের তিন মাস পূর্বে মাসিক মাহফিলের দিন আমাকে ইশারায় আন্দর মহলে ডেকে নিয়ে গেলেন। বললেন, আই যাইঙ্গো। হঠাৎ আমার অশ্রম্নজল নেমে আসলো। বাবাজান! আমি আপনার নির্দেশমতে, যা লিখেছি তা আমার ডায়েরীতে আছে। সেগুলো কি করব। তিনি বললেন, আই দেক্ষি। বেগুন আর কাছে জমা আছে। অর্থাৎ আমি দেখেছি। সবগুলো আমার কাছে। অতঃপর তিনি তাঁর দাফন—কাপনের বিষয়ে আমাকে নসিহত করেছিলেন। চেষ্টা করেছি তাঁর নির্দেশ মোতবেক তা বাস্তবায়ন করতে।
ইন্তেকাল
ইরশাদ হচ্ছে প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তবে সকলের মৃত্যু এক রকম নয়। মানুষের অবস্থা ভেদে মৃত্যুও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। কাফের ও মুশরিকদের জন্য মৃত্যু সর্বোচ্চ কষ্টকর ও যন্ত্রনাদায়ক। পক্ষান্তরে মুমিন, আল্লাহর প্রিয় বান্দদের জন্য মৃত্যু সবচেয়ে আনন্দের এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য উপহার। কেননা, মৃত্যুর মাধ্যমেই মহান প্রভূর সাথে তাদের মিলন হয়। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনুল করিমে ইরশাদ হচ্ছে,
يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي
অর্থাৎ হে শান্তিময় প্রাণ? স্বীয় প্রতিপালকের দিকে ফিরে যাও এমতাবস্থায় যে, তুমি তার উপর সন্তুষ্ঠ এবং তিনি তোমার উপর সন্তুষ্ট। অতঃপর আমার বিশেষ বান্দাদের মধ্যে প্রবেশ করো। এবং আমার জান্নাতে এসো। বস্তুত তারা তাদের প্রভূর কাছে জীবিত , রিযিকপ্রাপ্ত, এবং আনন্দময় অবস্থায় থাকেন।
হযরত শাহসূফি মুহাম্মদ নুরুল আবছার শাহ খলিল নগরী প্রভু প্রদত্ত অফুরন্ত করুণা বিতরণের পর ৮০ বৎসর বয়সে লক্ষ লক্ষ ভক্ত অনুরক্তকে শোক সাগরে ভাসিয়ে ১৪৩৮ হিজরীর ১৩ রমজান, ১৪২৪ বাংলার ২৬ জৈষ্ঠ, ২০১৭ সালের ০৯ জুন শুক্রবার দিবাগত রাত ১১ টায় আপন মুর্শিদের চরণে হাজিরা দিয়ে প্রিয়তম মাহবুব মহাম আল্লাহর সান্নিধ্যে গমন করেন। ইন্নলিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিউন।
স্বল্প সময়ের মধ্যে আল্লাহর ওলির ইন্তেকালের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পরদিন আসরের সময় খলিল নগর দরবার শরীফে হাজারো ভক্ত অনুরক্ত, লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল তার নামাজে জানাযায় অনিয়ন্ত্রিত জন সমুদ্রের সমাগমে ইমামতি করেন মুজাহিদে মিল্লাত হযরতুলহাজ্জ্ব আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ নুরুল মুনাওয়ার । নামাযে জানাযার পর খলিল নগর দরবার শরীফে তাকে দাফন করা হয়। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে,
مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَىٰ
অথার্ৎ যেখান থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি সেখানে তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করাবো এবং সেখান থেকে তোমাদেরকে পূর্ণরাই বের করবো। মাজার শরীফে অহরহ চলছে, দরুদ—সালাম ও ফাতিহা খানি। বর্তমানে বিশ্বের মুসলমানদের প্রথম কিবলা বাইতুল মাকদাসের আদলে নির্মাণাধীন দাদাজান খলিল নগরীর মাজার শরীফ সর্ব—সাধারণের অন্তরকে আকর্ষণ করে। মহান আল্লাহ তায়ালা এ মহান ব্যক্তিত্বের রুহানি তাওয়াজ্জু ও ফয়ুযাত আমাদেরকে দান করুন। আমিন, বিজাহিন নাবিয়্যিল আমিন ।
কোন মন্তব্য নেই