প্রচার বিমুখ অনুকরণীয় এক মুক্তিযোদ্ধার স্মরণে
এমন কিছু গুণীজন রয়েছেন,যারা আত্মপ্রচার ও খ্যাতির মোহ ত্যাগ করে নীরবে সমাজ, ও মানবসেবায় অসামান্য অবদান রেখে যান। তাঁরা বিনয়ী, সৎ এবং কর্মনিষ্ঠা দ্বারা সমাজের ভিত্তি মজবুত করেন। প্রচার বিমুখ বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য যুদ্ধ করেও প্রচারের আলোয় আসেননি, তাদের অনেকেই নিভৃতচারী। এরা আড়ালে থেকে মেধা ও শ্রম বিলিয়ে দিলেও, কাজের মাধ্যমেই তাঁরা অমর হয়ে থাকেন। এমনই একজনের জীবনী সংক্ষেপে তুলে ধরার প্রয়াস পেলাম।
জন্মক্ষণ: হযরত মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি ১৯৪৭ সালের ৫ জুন বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানাধীন ফতেপুর গ্রামের হেলাল চৌধুরী পাড়াস্থ বহদ্দার বাড়ি নিবাসী মরহুম হাজী মুহাম্মদ আবদুল খালেক ও মরহুমা গোলছাবা খাতুনের ঔরশে জন্মগ্রহণ করেন।
শিক্ষাজীবন: তিনি ধর্মীয় ও প্রাথমিক শিক্ষা আপন গ্রামের মকতব এবং এম.কে রহমানিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে পারিবারিক ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ: তিনি ১৯৭১ সালে কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী বীর উত্তম এর অধীনে ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁকে কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী বীর উত্তম নিজ হাতে মুক্তিযোদ্ধার সনদ প্রদান করেন। তাঁর বন্ধুবর বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম কামাল উদ্দিন (এফএফ কমান্ডার) সাহেব তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন।
কর্মজীবন: তিনি কিশোর বয়স থেকেই নিজ পিতার ব্যবসায়িক কাজে সহযোগিতা করার মাধ্যমে কর্মজীবনে পদার্পণ করেন। যুদ্ধ পরবর্তী মুক্তিবাহিনী থেকে ফিরে এসে তৎকালীন পাঁচলাইশস্থ আবদুল মান্নান মিস্ত্রীর নিকট অবস্থান করে যন্ত্রকৌশলে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে ঢাকা শহরে বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন অঞ্চলে জরুরি ইঞ্জিন পরিসেবা প্রদান করেন। অতঃপর গুলিস্তানের পাশ্ববর্তী ফুলবাড়িয়ায় একটি স্থায়ী ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ গড়ে তুলেন। ইত্যবসরে একদিন চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানাধীন ফতেপুর গ্রামের এম.কে রহমানিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন দোকানের সামনে যুগশ্রেষ্ঠ কলন্দর হযরত খলিলুর রহমান বিএবিটি মাইজভান্ডারীর একমাত্র খলিফা, হযরত নুরুল আবছার শাহ খলিলনগরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় হযরত আবদুল মাবুদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি স্কুলের পাশ্ববর্তী বিলের মাঝখানে (যেখানে বর্তমানে গরুর হাট বসে) দাঁড়িয়েছিলন। তাঁকে দেখে হুযূর ডাক দিলেন। তিনি হুযূরের নিকটে আসলে হুযূর পার্শ্বস্থ দোকান থেকে বেশি পরিমাণে চানাচুর তাঁকে দিয়ে বললেন,"বুবু (হযরত আবদুল মাবুদ রহমাতুল্লাহি আলাইহির আম্মাজান) কিছু খাবে, কিছু জমা রাখবে এবং কিছু বিলি করবে"। তিনি স্বীয় আম্মাজানের নিকট গিয়ে অনুরূপ বললেন। অতঃপর তিনি খলিল নগরী হুযূরের পদাংক সুচারু রূপে অনুসরণ করে দিব্যজ্ঞান অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালের ৫ রমযান তিনি ওমানের রাজধানী মসকোটে গমন করেন। সেখানে রুই— ওইলায়েট নামক স্থানে অবস্থান করে কালফাইন জায়েদ নামে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ গড়ে তুলেন। পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় আত্মীয়—স্বজন, বন্ধু—বান্ধবকে বিদেশ গমনে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা নিঃস্বার্থভাবে প্রদান করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। খলিলনগরী হুযূরের কৃপাদৃষ্টিতে প্রবাস জীবনে তাঁর সূনিপুন কর্মদক্ষতায় স্থানীয় ও প্রবাসী সকলের নিকট মাহাবুব মেকানিক নামে পরিচিতি লাভ করেন। এ সুনাম মধ্যপ্রাচ্যে থেকে ইউরোপের জার্মান অটোমোবাইল কোম্পানি সমূহে (ইগড, গঅঘ,ইত্যাদি) পৌঁঁছে যায়। মধ্যপ্রাচ্যস্থ প্রথম সারির অটোমোবাইল সার্ভিসিং সেন্টারে পরিগণিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে মায়ের নির্দেশক্রমে প্রবাস জীবনের ইতি টানেন এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন ও প্রসারে মনোনিবেশ করেন।
বিবাহ: ১৯৮৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম বায়েজিদ থানাধীন কুলগাঁও গ্রামের ফকিরপাড়া নিবাসী কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন চেম্বার ম্যাজিস্টেড, চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিট্রিশ অনাররী চীপ দায়রা জর্জ মাওলানা সৈয়দ আলী আহমদ মতোয়াল্লী রহমাতুল্লাহি আলাইহির বড় শাহজাদা আবদুল ওয়াজেদ রহমাতুল্লাহি আলাইহির ছোট কন্যা জান্নাতুল ফেরদৌসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের ঔরশে দুই পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
আধ্যাত্মিক জীবন: ১৯৮২ সালের দিকে খলিনগরী হুযূরের সাথে সম্পর্ক গভীরতর হয়। দেশে এবং বিদেশে অবস্থানকালে আপন মুর্শিদের আস্তানা খলিল নগর দরবার শরীফের কর্মকান্ডে নিজেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নিয়োজিত রেখে হুযূরের স্নেহধন্য হন। ওমানে অবস্থানকালীন সময়ে সামায়েল শহরে অবস্থিত প্রখ্যাত সাহাবী হযরত মাজেন বিন গদুয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর দরবারে দীর্ঘদিন রিয়াজত করেছিলেন এবং তাঁর ফয়েজ লাভে ধন্য হয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে ফয়েজলেকস্থ দারুল হুদা দরবারের অন্যতম খলিফা, হযরত মাওলানা শফিকুল ইসলাম রহমাতুল্লাহি আলাইহির দস্তে মুবারকে কাদেরিয়া তরিকার বাইয়াত গ্রহণ করেন। কঠোর সাধনা—রিয়াজতের মাধ্যমে মুর্শিদদ্বয়ের সন্তুষ্টি অর্জনকরতঃ সুলতানুল আরেফিন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী ও যুগশ্রেষ্ঠ কলন্দর হযরত খলিলুর রহমান বিএবিটি মাইজভান্ডারী (কুদ্দিসা সিররুহুল আযিয) এর বিশেষ ফয়েজে ধন্য হয়ে আত্ম মানবতার সেবায় নিজেকে আমরণ নিয়োজিত করেন। আমৃত্যু শেরে খোদা মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শান ও মান আদবের সহিত প্রচার ও প্রসার করে ভক্তবৃন্দকে নিম্নোক্ত তিনটি মৌলিক শিক্ষা প্রদান করেন—
১.হালাল—হারামের জ্ঞান অর্জন করা।
২.ধর্ম—কর্ম এক করে জীবন যাপন করা।
৩.সর্বাবস্থায় আদবের সহিত চলা।
ইন্তেকাল: ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী, ১৪৪৭ হিজরীর ১১ শাবান দিবাগত রজনী ১৪৩১ বাংলা ২৮ মাঘ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। ইন্তেকালের সময় এক স্ত্রী ও দুই ছেলে সন্তান ও ভক্ত—অনুরক্ত রেখে যান। পর দিন বুধবার সকাল ১১টায় জে বটতলী বায়তুল হামদ হাশেমী শাহী জামে মসজিদে তাঁরই সুযোগ্য ছোট সন্তানের ইমামতিতে নামাযে জানাযা সম্পন্ন হয়। তাঁর নির্দেশ মোতাবেক তাঁকে চট্টগ্রাম বায়েজিদ থানাধীন কুলগাঁও গ্রামের খাজা রোডস্থ তাঁর রিয়াজতস্থলে সমাহিত করা হয়। তাঁর স্মরণে প্রতি বুধবার সাপ্তাহিক, প্রতি বাংলা মাসের ২৮ তারিখে মাসিক ফাতেহা এবং ২৮ মাঘ বাৎসরিক ওরস অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর জীবদ্দশায় প্রবর্তিত পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ১১ রবিউস সানী ফাতেহায়ে ইয়াজদাহুম এবং ২১ রমযান ওরসে শেরে খোদা, মাওলা আলী রাদ্বিল্লাহু আনহু উদযাপনে আজিমুশশান মোশায়েরা মাহফিল ও খতমে কুরআনুল করিম ও খতমে গাউছিয়া শরীফের আয়োজনের মাধ্যমে প্রত্যেক বৎসর ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কল্যাণ কামনায় দোয়া—মুনাজাত করা হয়।
লেখক: মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
আরবি প্রভাষক ও ইসলামী গবেষক
ই—মেইল: masum.jasa.ctg@gmail.com

কোন মন্তব্য নেই