Header Ads

Header ADS

প্রিয় নবীর ছায়াসঙ্গী

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সেই মহান বক্তিত্ব, ইতিহাসে যার নাম ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত; ইসলামের প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে জানবাজি রেখে যিনি নিরলস সেবা দিয়ে সারাজীবন পরিশ্রম করেছেন। ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে মক্কা মুকাররমায় কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন। যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাল্যকালের সাথী ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর প্রায় সারাক্ষণ নবীজির দরবারে পড়ে থাকতেন। কি যুদ্ধ, কি সফর সব কর্মসূচিতে সিদ্দিকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর অবস্থান থাকতো নবীজির সান্নিধ্যে। তিনি টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ সবকিছু প্রিয় নবীজির কদমে উৎসর্গ করেছেন, এমনকি নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। হিজরতের রাতে তিনি রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে পথ অতিক্রম করছিলেন। যখন সওর পর্বতের নিকটে আসলেন তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আগে প্রবেশ করি, গর্তে বিষাক্ত প্রাণী থাকতে পারে। তারা আঘাত করলে আগে আমাকে করুক কিন্তু প্রাণ থাকতে আপনার বিন্দুমাত্র কষ্ট আমি সহ্য করতে পারবো না। অতঃপর তিনি রাসূলের অনুমতিক্রমে গুহায় প্রবেশ করে নিজের পরনের কাপড় ছিড়ে গুহার সমস্ত ছিদ্র বন্ধ করে দিলেন, কাপড়ের অভাবে যে চিত্র বন্ধ করতে পারেন নি সেটি নিজের পায়ের গোড়ালি দ্বারা চেপে ধরলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এবার তাশরীফ আনুন। এরপর নবীজি তাঁর কোলে বিশ্রাম করছিলেন, এসময় রাসূলুল্লাহর দর্শন লাভে দীর্ঘদিন ধরে গর্তে অপেক্ষমাণ একটি বিষধর সাপ সব ছিদ্র বন্ধ দেখে সিদ্দিক রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পায়ের গোড়ালী দিয়ে চেপে রাখা ছিদ্র দিয়ে বের হবার চেষ্টা করল। কিন্তু না পেরে শেষ পর্যন্ত তাঁকে দংশন করলো। তবুও তিনি ছিদ্র থেকে পা সরালেন না, এমনকি একটু নড়াচড়াও করলেন না। মনে মনে বলতে লাগলেন প্রাণ যেতে পারে কিন্তু নবীজির আরামে ব্যাঘাত হতে দিবো না। অতঃপর সারা শরীরে বিষ ছড়িয়ে পড়লে মনের অজান্তে নয়নবারি রাসূলুল্লাহর চেহেরা মুবারকে পরতেই নবীজি বললেন, আবু বকর! তুমি কাঁদছো কেন? তোমার কি হয়েছে? জবাবে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে সাপে কেটেছে। তখন রহমাতুল্লিল আলামীন স্বীয় থুথু মুবারক দংশিত স্থানে লাগাতেই সমস্ত শরীরের বিষ মুহূর্তের মধ্যেই পানি হয়ে গেল এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন। হিজরতের পর দীর্ঘ দশ বছর নবীজির সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে সফল ও সার্থক করেন। নবীজির ইন্তেকালের পর দু বছরের বেশি সময় খেলাফতের মসনদে আসিন ছিলেন। তাঁর খিলাফতকাল দীর্ঘ না হলেও তিনি একজন সফল শাসক হিসাবে ভন্ড নবী দাবিদারদের রিদ্দার যুদ্ধের মাধ্যমে দমন করেন এবং তৎকালীন দুটি পরাশক্তি পারস্য ও বাইজেন্টাইনদের উপর সফল অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানের ধারাবাহিকতায় কয়েক দশকে মুসলিম খিলাফত ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যের একটিতে পরিণত হয়।

রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের সেই কঠিন মুহূর্তে সিদ্দিকে আকবরের কোরবানী, বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য ও বন্ধুত্বের কথা ইতিহাসে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। তাঁর সাহচর্যের কথা তো পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা তাওবার ৪০ নম্বর আয়াতে “দুই জনের মধ্যে দ্বিতীয়” আখ্যায় তাঁর নাম অমর করে এই আত্মত্যাগী মহান ভক্তকে পুরস্কৃত করেছেন।
ফারূকে আযম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন “আমর আশা ছিল যে, আমার গোটা জীবনের আমল যদি হযরত সিদ্দিকে আকবরের এক রাত্রির আমলের সমান হতো! তা সেই রাত্রি, যেই রাত্রিতে তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হিজরতের সফরে সওর গুহার দিকে রওনা হন।” সেদিকে ইঙ্গিত করে ইমাম আহমদ রেজা খান রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সওর পর্বতে রাসূলের প্রেমে নিজের প্রাণকে বিসর্জন দিয়েছেন, অথচ প্রাণ বাঁচানো ফরজ। কিন্তু সিদ্দিকে আকবর রাসূলের প্রতি নিখাদ প্রেমের কারণে এর চিন্তাও করেননি। কেননা, হুযূরের খেদমত এবং গোলামী করা সকল ফরজের মূল আর অন্য ফরজগুলো হল এর শাখা। এ প্রসঙ্গে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সকল মানুষ থেকে অধিক প্রিয় হবো না।

৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মোতাবেক হিজরি ১৩ সনের জমাদিউল আখের মাসে সিদ্দিকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর উত্তরসূরি মনোনীত করার জন্য প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলে অন্যান্য সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দেন। অসুস্থতার মাত্রা বেড়ে গেলে মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে বলেন, আমি মারা গেলে আপনার সেই হাতে গোসল দিবেন, যে হাতে প্রিয় নবীকে গোসল দিয়েছেন। অতঃপর সুগন্ধি লাগিয়ে লাশ কাফন পরিধান করে নবীজির রওজা পাকের সামনে নিয়ে রেখে নবীজির দরবারে আবেদন করবেন - ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার বাল্যবন্ধু, যৌবনকাল ও হিজরতের সাথী আজ আপনার কদমে হাজির। এতে যদি সাড়া পাওয়া যায় তাহলে আমাকে সেখানে দাফন করবেন অন্যথায় জান্নাতুল বাকীতে (কবরস্থানে) দাফন করবেন। সিদ্দিক আকবরের ইন্তেকালের পর (২৩ আগস্ট) নির্দেশমত হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু লাশ মুবারক রাসূলের রওজা পাকের সামনে হাজির করে উল্লেখিত আবেদন করার পর রওজা পাক থেকে স্পষ্ট আওয়াজ ভেসে আসে- “আদখিলুল হাবীবা ইলাল হাবীব” অর্থাৎ তোমরা বন্ধুকে বন্ধুর সাথে মিলিয়ে দাও। কারণ, বন্ধুর জন্য বন্ধু অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। [খাসাযেসুল কুবরা; সহিহ বুখারী; রযীন মিশকাত;দালায়িলুন নবুয়ত]

লিখক: আরবি প্রভাষক,রাণীরহাট আল-আমিন হামেদিয়া ফাযিল মাদরাসা; খতিব, রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ জামে মসজিদ


প্রকাশকাল: দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১১ ফেব্রুয়ারি'২১ বৃহস্পতিবার      https://www.dailynayadiganta.com/diganta-islami-jobon/561935/প্রিয়-নবীর-ছায়াসঙ্গী 

কোন মন্তব্য নেই

 

Blogger দ্বারা পরিচালিত.